প্রাচীন বই - এক জায়গায় পুরোনো বাংলা বইপত্র | কলিকাতা কল্পলতা

কলিকাতা কল্পলতা

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়


ভূমিকা

রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের (জন্ম: ১৮২৭ মৃত্যু: ১৩ মে ১৮৮৭) আদি নিবাস বর্তমান হুগলি জেলার বাকুলিয়া। তাঁর পিতার নাম রাম নারায়ণ। মায়ের নাম জানা যায় না। রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় হুগলি মহসিন কলেজে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। ইংরেজি, সংস্কৃত এবং প্রাচীন ওড়িয়া কাব্য ও সাহিত্যে তাঁর জ্ঞান ছিল। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় তিনি সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এডুকেশন গেজেট পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন তিনি। সেই সময়ের এডুকেশন গেজেটে তাঁর গদ্য এবং পদ্য দুই রকম রচনাই প্রকাশিত হতো। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সিকলেজে ৬ মাস অধ্যাপনা করবার পর আয়কর অ্যাসেসর এবং ডেপুটি কালেক্টর হন। তারপর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে চাকরি শুরু করেন। ১১ এপ্রিল ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে অবসর নেন। তিনি মূলত স্বদেশপ্রেমিক কবিরূপে বিখ্যাত। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'পদ্মিনী উপাখ্যান', 'কর্মদেবী’ এবং ‘শূরসুন্দরী’। টডের ‘অ্যানাল্স অব রাজস্থান' থেকে কাহিনীর অংশ নিয়ে তিনি 'পদ্মিনী উপাখ্যান’ রচনা করেন। অনুবাদ সাহিত্যে আছে সংস্কৃত থেকে ঋতুসংহার এবং কুমারসম্ভব (১৮৭২), নীতিকুসুমাঞ্জলি (১৮৭২), হোমারের মহাকাব্যের অনুবাদ 'ভেক-মুষিকের যুদ্ধ' | ১৮৮২ সালে তিনি মুকুন্দরামের কবিকঙ্কন চণ্ডি সম্পাদনা করে প্রকাশিত করেন | ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে রচিত 'কাঞ্চী কাবেরী' কাব্যগ্রন্থ প্রাচীন ওড়িয়া কাব্যের অনুসরণে লিখিত৷ তিনি ‘উৎকল দর্পণ’ নামে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া তিনি রস সাগর, বার্তাবহ, এডুকেশন গেজেট ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ওড়িশার পুরাতত্ত্ব ও ওড়িয়া ভাষা সম্বন্ধে বহু নিবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। "স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে কে পরিবে পায়"... উপরের লাইন ক’টি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মিনী উপাখ্যান'-এর অংশ। ভারতবর্ষে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে এই লাইনগুলো উদ্দীপনামূলক ভূমিকা রেখেছে।

কলিকাতা কল্পলতা গ্রন্থটিই সম্ভবত বাংলা ভাষায় কোলকাতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। 'কলিকাতা কল্পলতা' থেকে ছোট একটি উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে: এক রহস্যজনক জনশ্রুতি এই যে, ইংরাজেরা যখন প্রথমতঃ এইস্থানে বাণিজ্যালয় স্থাপনার্থ আগমন করিলেন তখন গঙ্গাতীরে দণ্ডায়মান কোন লোককে অঙ্গুলী প্রসারণ পূর্বক স্থানের নাম জিজ্ঞাসা করাতে সে ব্যক্তি সেইদিকে শায়িত এক ছিন্নবৃক্ষ দেখিয়া মনে করিল সাহেবরা কবে ঐ বৃক্ষছেদন হইয়াছে, তাহাইজিজ্ঞাসা করিতেছেন৷ অতএব সে উত্তরচ্ছলে কহিল- "কালকাটা”। সেই হইতে ইংরাজেরা ইহার নাম “ক্যালকাটা” রাখিলেন। জনশ্রুতি থেকে সাহিত্যিক উপাদান আর নথিপত্র, বহুবিধ উৎসের তথ্য বাছ-বিচার করে তিনি কোলকাতার ইতিহাস রচনা করেন।


অধ্যায় বিভাগ

প্রস্তাবনা
প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায়
পঞ্চম অধ্যায়
ষষ্ঠ অধ্যায়
সপ্তম অধ্যায়
সপ্তম অধ্যায়ের বর্দ্ধিতাংশ ॥ শোভাবাজারীয় রাজ পরিবার
অষ্টম অধ্যায়

পর্ব

প্রস্তাবনা

...এইক্ষণেও কলিকাতা নগরে এমন দুই চারিজন লোক পাওয়া যায় যাঁহারা অমরাবর্তী তুল্য চৌরঙ্গীকে ব্যাঘ্রনিবাস জঙ্গল ও গড়ের মাঠে হলপ্রবাহ দৃষ্টি করিয়াছেন, যে সময়ে দস্যুভয়ে সাহেবদিগের ভৃত্যগণ শুভ্রবস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া মলিন বেশে ঐ মাঠ দিয়া গমনাগমন করিত এবং রাত্রিযোগে সাহেবরা প্রাণভয়ে মুহুর্মুহুঃ বন্দুক ধ্বনি করিতেন। “অন্যে পরেকা কথা” যে হেদুয়া পুষ্করিণীর পূর্ব পশ্চিম তীর এক্ষণে বিদ্যাচর্চ্চার গণ্যস্থান হইয়াছে দিবসের মধ্যভাগে সেই সরোবরকে লোকে ভয়াবহ জ্ঞান করিত এবং সন্ধ্যার পর কাহার সাধ্য সেই মুখে গমন করে। একশত বৎসর হইল-কলিকাতা নগরী ভয়াবহ ব্যাঘ্র নক্রাদির সজল জঙ্গলময় বসতীস্থলী ছিল কিন্তু এক্ষণে সেই কলিকাতায় নিয়ত ৫/৬ লক্ষ লোক বাস করিতেছে।

কলিকাতা কি ছিল এবং কি হইয়াছে তদ্বিষয়ে অধিক বক্তব্য পর পৃষ্ঠার তালিকায় প্রকটিত পুরাতন দুর্গের চিত্ৰ দেখিলে এখনকার লোকেরা বিস্ময়াপন্ন হইবেন সন্দেহ নাই, যেহেতু এক্ষণে উক্ত দুর্গের চিহ্নমাত্র দ্রষ্টব্য নহে-পরন্ত তাহা অন্য কোন নগরের প্রতিরূপ বোধ হইতে থাকিবে। আচার, ব্যবহার, রীতি-নীতি, পরিচ্ছদ, ভাষা প্রভৃতি বিষয়ে অত্রত্য লোকের এই স্বল্পকাল মধ্যে এরূপ পরিবর্ত্তন হইয়া আসিয়াছে যে যদি বৈষ্ণবচরণ শেঠ প্রভৃতি বিগত শতাব্দির প্রসিদ্ধ লোকেরা দৈববশে পুনর্জীবন প্রাপ্ত হইয়া কলিকাতায় পুনরুদিত হন তবে এখনকার কৃতবিদ্য নব্য সম্প্রদায়কে দেখিয়া স্বদেশীয় জ্ঞান করিতে সাহসী হইবেন না।

অতএব এই সময়ে আসিয়াখণ্ডের সর্বপ্রধান নগরী এই কলিকাতায় শতবৎসরের পুরাবৃত্ত সংগ্রহ অতি প্রয়োজনীয় বোধ হইতেছে। পরে তদ্বিষয়ে চেষ্টা করাও ব্যর্থ হইবে। এখনও অনেক স্থানীয় লোক জীবিত আছেন এবং দুই-একখানি প্রাচীন পুস্তক প্রাপ্ত হওয়া যায়। কিন্তু কিছুকাল পরে এতদুভয় দুর্লভ হইয়া উঠিবে৷ এই সব বিবেচনা করিয়া “কলিকাতা কল্পলতা” নামে অভিনব গ্রন্থের রচনাকার্য্যে হস্তক্ষেপ করা গেল।


প্রথম অধ্যায়

কলিকাতার প্রাচীনত্ব-বাঙ্গালাদেশের আদ্য রাজধানী নিচয়প্রাচীন গ্রন্থে কলিকাতার নামোল্লেখ-কবিকঙ্কন-ঘটকের কারিকা- কলিকাতা-নামের ব্যুৎপত্তি-শেঠ, বসাকদিগের আদ্যস্থান,ঢাকা, হরিদপুর, পাতরিয়াঘাটায় প্রবাস-শেঠ, বসাকদিগের নাম-প্রথম ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ পরিবার।

কলিকাতার প্রাচীনত্ব বিষয়ে অনেক মহাশয়ের ভ্রান্তি আছে। অনেকে কলিকাতা নাম অতি আধুনিক মনে করেন—ফলতঃ আমরা নিশ্চিতরূপে কহিতেছি যে কলিকাতা গত শতাব্দীর মধ্যে হিসাবে পরিগণিত হইলেও বস্তুতঃ বহু কালাবধি গ্রাম পদবীতে গণনীয় ছিল। কোন মহাশয় গ্রন্থ বিশেষে লিখিয়াছেন যে, কলিকাতাকে বাঙ্গালাদেশের ষষ্ঠ রাজধানীরূপে গণ্য করা যাইতে পারে-প্রথম গৌড়, দ্বিতীয়রাজমহল, তৃতীয় ঢাকা, চতুর্থ নবদ্বীপ, পঞ্চম মুর্শিদাবাদ এবং ষষ্ঠ কলিকাতা। কিন্তু ইহার মধ্যে কিছু ভ্রম প্রমাদ দৃষ্ট হইতেছে। বাঙ্গালাদেশের আদ্য রাজধানী যে গৌড় নগর ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ মাত্র নাই, কিন্তু নবদ্বীপ নগর প্রকৃত প্রস্তাবে রাজধানী মধ্যে গণনীয় নহে৷ সেনবংশী ভূপতিরা গৌড় নগরেই অবস্থানপূর্বক রাজকার্য অবধারিত করিতেন কিন্তু মধ্যে মধ্যে সুবর্ণ গ্রামে এবং নবদ্বীপে বিরাজ করিতেন—এজন্য যদি নবদ্বীপ রাজধানী মধ্যে ধর্তব্য হয়, তবে সুবর্ণ গ্রাম এবং বাঙ্গালাদেশের সর্বপ্রধান বাণিজ্যস্থল সপ্তগ্রামকেও রাজধানী বলা যাইতে পারে। সপ্তগ্রামের প্রতিভা বিষয়ে এতদ্দেশীয় কোন প্রাচীন কবি এরূপ উক্তি করেন। যথা:-

"কলিঙ্গ তৈলঙ্গ অঙ্গ বঙ্গাদি কর্ণাট।

মহেন্দ্র মগধ মহারাষ্ট্র গুজরাট।

বারেন্দ্র বন্দর বিন্ধ্য পিঙ্গল সফর।

উৎকল দ্রাবীর রাঢ় বিজয় নগর।

মথুরা দ্বারকা কাশী কল্পপুর কায়া।

প্রয়াগ কৌরবক্ষেত্র গোদাবরী গয়া।

ত্রিহট্ট কাঙ্গর কোচ হাঙ্গর শিলট।

মানিক করিকা লঙ্কা প্রলম্ব লাঙ্গট।

বাগন বলিয়া দেশ কুরুক্ষেত্র নাম।

বটেশ্বর আহুলঙ্ক্ষাপুর স্বর্ণগ্রাম॥

শিবাহট্ট মহাহট্ট হস্তিনা নগরী।

আর যত সহর তা বলিবার নারি।

এ সব সহরে যত আছে সদাগর।

কত ডিঙ্গা লয়ে তারা যায় দেশান্তর৷

সপ্তগ্রামী বণিক কোথাও নাহি যায়।

রে বস্যে সুখ মোক্ষ নানা ধন পায়।

তীর্থ মধ্যে পূর্ণ তীৰ্থ ক্ষিতি মোক্ষ ধাম৷

সপ্তঋষি শাসন বলিয়া সপ্ত গ্রাম৷ "

পরন্ত যদিও মুর্শিদাবাদের ভঙ্গদশান্তে কলিকাতার শ্রীসৌঠব বৃদ্ধি হউক, বস্তুতঃ সরস্বতী নদীর স্রোতমান্দ্য বশতঃ এই সপ্তগ্রাম নগরীর গরিমা হ্রাস হওয়াতেই কলিকাতায় বাণিজ্য লক্ষ্মীর আবির্ভাব হইয়াছে; পূর্বে কি ইউরোপীয় এবং কি এদেশীয় বণিক মাত্রই সপ্তগ্রামে যাইয়া বাণিজ্য করিতেন। সপ্তগ্রামের শ্রীহীনতার অব্যবহিত পরেই পর্তুগীজদের অধীনে কিছুকাল হুগলী নগরের শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল৷ কিন্তু সপ্তগ্রামীয় বস্ত্র ব্যবসায়ী-বণিকেরা ইউরোপীয়দিগের মধ্যে ইংলণ্ডীয়দিগের সহিত ব্যবসায়ে অধিক লভ্য ও তাঁহাদিগের অধীনে নির্বিঘ্নে বসতি করণের সমধিক উপযোগিতা দর্শন করিয়া কলিকাতায় আসিয়া বসতি করিলেন, তদবধি এই নগরের শোভা ও প্রতিভা পদ্মবনের ন্যায় অতি অল্পকালের মধ্যে বর্দ্ধিত হইয়া উঠিল।

অপিচ কলিকাতার প্রাচীনত্বের বিষয় আমরা পুনর্বার অনুসরণ করি,-এইস্থান যে নিতান্ত আধুনিক নহে, তাহার বহুল প্রমাণ লব্ধ না হইলেও পুষ্টিপূরক বিলক্ষণ নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে। এদেশের একজন প্রাচীন কবি অর্থাৎ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, যিনি কবিকঙ্কন নামে বিখ্যাত আছেন—তৎচিত চণ্ডী কাব্যে শ্রীমন্ত সাধুর সিংহল দ্বীপে বাণিজ্য প্রস্থান প্রকরণে এইরূপ লিখিত হইয়াছে। যথা:-

নায়ে তুলে সদাগর নিল মিঠা পাণী।

বাহ বাহ বলিয়া ডাকেন ফরমাণী।

গরিফা বাহিরা সাধু বাহে গোন্দল পাড়া।

জগদ্দল এড়াইয়ে গেলেন নপাড়া

ব্রহ্মপুত্র পদ্মাবতী সেই ঘাটে মেলা।

ইছাপুর এড়াইল বানিয়ার বালা।

উপনীত হইল নিমাই তীর্থ ঘাটে।

নিমের বৃক্ষেতে যথা জবা ফুল ফোটে৷

ত্বরায় চলয়ে তরী তিলেক না রয়।

ডাহিনে মাহেশ বামে খড়দহ কয়৷

কোন্নগড় কোতরঙ্গ এড়াইয়ে যায়।

সর্বমঙ্গলার দেউল দেখিবারে পায়।

ছাগল মহিষ মেষে পূজিয়া পার্বতী।

কুচিনাল এড়াইল সাধু শ্রীয়পতি৷

তীরসম ছোটে তরী তরঙ্গের ঘায়।

চিত্রপুর এড়াইয়া শালিখাতে যায়॥

কলিকাতা এড়াইল বানিয়ার বালা।

বেতরতে উত্তরিল অবসানে বেলা।

বেতাঙ্গ চণ্ডিকা পূজা করি সাবধানে।

ধনতার গ্রাম সাধু এড়াইল বামে৷

ডাহিনে ত্যজিয়া যায় হিজুলীর পথা

কিনিয়া লইল রাজহংস পারাবত।

বালীঘাটা এড়াইল বানিয়ার বালা।

কালীঘাটে উপনীত অবসানে বেলা॥

এক্ষণে ত্রিবেণী হইতে কালীঘাট পৰ্য্যন্ত উল্লেখিত গ্রামনিচয়ের প্রাচীনত্ব বিষয়ে সংশয় মাত্র থাকিতে পারে না। কলিকাতা দূরে থাকুক খিদিরপুরের উত্তরে অবস্থিত বালীঘাটার নাম পর্য্যন্ত প্রাপ্ত হইতেছে অথচ খিদিরপুরের নামোল্লেখ দৃষ্ট হয় না। প্রত্যুত এই কাব্যগ্রন্থ অল্পদিনের নহে। কবিকঙ্কন লেখেন:-

শকে রস রস বেদ শশাঙ্ক গণিতা।

কব কত দিল পীত হরের বণিতা।

'অঙ্কস্য বামগতি' এই নিয়মে গণনা করিলে চণ্ডীগ্রন্থ ১৪৬৬ শকে প্রস্তুত বিধায় ইহাই প্রমাণ হইতেছে কলিকাতা গ্রাম তিনশত বৎসরেরও অনেক পূর্ব্বে বর্তমান ছিল।

অপর, দেবীবর কর্তৃক এদেশীয় কুলীনদিগের মেল বদ্ধ হইলে পর তাঁহারা যে যে স্থানে বসতি করেন, সেই সেই স্থানের নামানুসারে বিখ্যাত হন৷ যথা:—ফুলিয়ার মুখুটি, খনিয়ার চাটুতি, সাগরদহের বন্দ্য, কলিকাতার ঘোষাল—ইত্যাদি। ঘোষালবংশীয় পশো হইতে কলিকাতার ঘোষাল নাম হয়। যথা করিকা-

এই পশো অন্যূন...বৎসর গত হইল বর্তমান ছিলেন। সুতরাং ইহাতেও কলিকাতার প্রাচীনত্বের প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে।

কলিকাতা নামের ব্যুৎপত্তি বিষয়ে বহুতর কল্পনা কল্পিত হইয়াছে। কোন মহাশয় লিখিয়াছেন যে, অনেক নগরের নাম দেবমণ্ডপাদির আখ্যা অনুসারে প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকে; অতএব বোধ হয় কলিকাতার অদূরবর্তী পীঠস্থান কালীঘাটের নামানুসারে ইহার নামকরণ হইয়া থাকিবে। অর্থাৎ কলিকাতার নাম, কালীঘাট অথবা কালীঘাঠার অপভ্রংশ মাত্র। অন্য এক মহাশয় লেখেন, ইং ১৭৪২ অব্দে মহারাষ্ট্রীয় উৎপাত নিবারণার্থ যে পরিখা খনিত হয়, সেই 'খাল কাটা' হইতে 'কলিকাতা' নাম উৎপন্ন হইয়া থাকিবে, যেহেতু উক্ত অব্দের অনেক পূর্ব্বে কলিকাতা নাম প্রচলিত ছিল না। এই উভয় ব্যুৎপত্তি যে বিলক্ষণ অমূলক তাহা উপরিভাগে পদ্য ও কারিকায় সপ্রমাণ করিতেছে, কারণ ইং ১৭৪২ অব্দের অনেক পূর্বে কলিকাতা নাম প্রচলিত ছিল৷

প্রাগুক্ত ব্যুৎপত্তিদ্বয় ব্যতীত আর এক রহস্যজনক জনশ্রুতি এই যে, ইংরাজেরা যখন প্রথমতঃ এইস্থানে বাণিজ্যালয় স্থাপনার্থ আগমন করিলেন তখন গঙ্গাতীরে দণ্ডায়মান কোন লোককে অঙ্গুলী প্রসারণ পূর্বক স্থানের নাম জিজ্ঞাসা করাতে সে ব্যক্তি সেইদিকে শায়িত এক ছিন্নবৃক্ষ দেখিয়া মনে করিল সাহেবরা কবে ঐ বৃক্ষছেদন হইয়াছে, তাহাই জিজ্ঞাসা করিতেছেন। অতএব সে উত্তরচ্ছলে কহিল-"কালকাটা”। সেই হইতে ইংরাজেরা ইহার নাম “ক্যালকাটা” রাখিলেন। এই ব্যুৎপত্তি অমূলক হইলেও ইহার রচয়িতার চতুর বুদ্ধির ব্যাখ্যা করা কর্তব্য৷ ফলতঃ কোৎরঙ্গ—কুচিনান প্রভৃতি গ্রামাখ্য যেমন নিরর্থক, কলিকাতা শব্দও যে সেইরূপ নিরর্থক তাহাতে সন্দেহ করিবার প্রয়োজন নাই।

এইরূপে কলিকাতার প্রাচীনত্ব সাব্যস্ত হইলেও তাহা বহুকালাবধি ইতর লোকের বাসস্থান ছিল,—অনন্তর অনুমান দুইশত বৎসর বিগত হইল সপ্তগ্রামের শেঠ ও বসাকখ্যাত তন্ত্রবায় জাতীয় ব্যবসায়ীগণ উক্ত প্রাচীন নগরের নিকটবর্তী আপনাদিগের বাসস্থান হরিদপুর গ্রাম পরিত্যাগ পূর্বক কলিকাতায় আসিয়া বসতি করেন৷ এই শেঠ বসাকদের পূর্ব নিবাস ঢাকায় ছিল৷ অদ্যাপি তৎপ্রদেশে তাঁহাদিগের মধ্যে কোন কোন ব্যক্তির ভূসম্পত্তি আছে। আমাদিগের আত্মীয় কোন বসাকের নিকট তাঁহার পূর্বপুরুষের অধিকৃত ঢাকার নিকটস্থ কতিপয় গ্রামাদির কাগজপত্র আছে; ফলতঃ অন্যূন একশত বৎসর হইল তাঁহারা ঐ বিষয়ের অধিকার ভ্রষ্ট হইয়াছেন।

ঢাকার শেঠবসাকেরা যদিও কলিকাতার শেঠবসাকদিগের সহিত একগোত্রজ হউন কিন্তু বহুদিবস যাবৎ তাঁহাদিগের পরস্পর বিচ্ছেদ বশতঃ এক্ষণে করণ-কারণ রহিত হইয়াছে। মুর্শিদাবাদের তন্তবায় কারফরমাদিগের সঙ্গেও কলিকাতাস্থ শেঠবসাকদিগের এই রূপ সম্বন্ধা মৃত রাধাকৃষ্ণ বসাক কারফরমাদিগের সহিত পুনর্বার কুটুম্বিতা করণের প্রস্তাব করে। তাহাতে কারফরমারা সম্মত হইয়াছিলেন কিন্তু এক সামান্য অনৈক্য সূত্রে এই বাঞ্ছনীয় সদ্ভাব সংস্থাপনে ব্যাঘাত সম্ভূত হয়৷ তাহা এই যে, কারফরমাকুলের অঙ্গনাগণ বামাঙ্গে রজতালঙ্কার পরিধান করেন। কারফরমারা সেই পুরুষ পরম্পরা প্রচলিত কুলাচার পরিত্যাগে সম্মত না হওয়ায় রাধাকৃষ্ণ বসাক পূর্ব প্রস্তাবে পরাজ্জুমুখ হইলেন৷ সে যাহাই হউক ঢাকাই শেঠবসাকদিগের আদ্যস্থান। তথা হইতে তাঁহারা প্রথমে মুর্শিদাবাদ ও তৎপরে সপ্তগ্রামের নিকট হরিদপুরে বসতি করেন। তদনন্তর সপ্তগ্রাম ও হুগলীর প্রতিভা হ্রাস হইলে কলিকাতায় আসিয়া বড়বাজারে বসবাস করিতে লাগিলেন—অভিপ্রায় এই যে, সরস্বতী মন্দা পড়িয়া গেলে ভাগীরথী প্রবলা থাকায় ইউরোপীয়েরা সেই নদী হইয়া আগমন পূর্ব্বক বাণিজ্য-ব্যবসা করিবেন-সুতরাং যত অগ্রসর হইয়া থাকা হয় ততই উভয় পক্ষের মঙ্গল। শেঠবসাকেরা ঐ স্থানে বসতিপূর্বক আপনা-দিগের ব্যবসানুসারে "সুতালুটি” শব্দে তাহার নামকরণ করিলেন।

হিন্দু ভদ্রগ্রামের লক্ষণ ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থাদি সজ্জাতির বাস—যেহেতু তাঁহাদিগের অভাবে যজন, যাজন, চিকিৎসা পথ্য ও লিখন পঠনের উপায় থাকে না। অতএব উক্ত সুসম্পন্ন তন্তবায়েরা একঘর ব্রাহ্মণ, একঘর বৈদ্য, এবং একঘর কায়স্থ আনাইয়া আপনাদিগের নিকটে সংস্থাপিত করেন। পাতুরিয়াঘাটার শুদ্ধ শ্রোত্রীয় ঠাকুরগোষ্ঠী উক্ত ব্রাহ্মণের এবং সেইস্থানে মজুমদার খ্যাত বৈদ্যেরা এবং কলিকাতা নিবাস গ্রথম কায়স্থের বংশধরগণ হয়েন।


দ্বিতীয় অধ্যায়

ইংরাজদিগের বাঙ্গালাদেশে বাণিজ্য করণার্থ অনুমতি প্রাপ্তি- বালেশ্বর ও হুগলীতে বাণিজ্যালয় স্থাপন—ভাগীরথীতে ইংরাজদিগের জাহাজ প্রবেশ-নিরন্তর বাণিজ্য করণের শক্তিলাভ-সাগরসঙ্গমের নিকট দুর্গনির্মাণের অভিসন্ধি-নবাবের সহিত ইংরাজদিগের মতান্তর, পোতাধ্যক্ষ নিকলসনের দশখানা জাহাজ সমভিব্যাহারে ভাগীরথী প্রবেশ-হুগলী নগর ধ্বংস-ইংরাজদিগের বাণিজ্যালয়সমূহের প্রতি আক্রমণ—সুতালুটিতে চার্ণক সাহেবদের প্রস্থান ও তথা হইতে হিজলী উপদ্বীপে আশ্রয়—ইব্রাহিম খাঁ নবাব কর্তৃক ইংরাজদিগেকে পুনরাহ্বানকলিকাতা নগর স্থাপন—দোভাষী শব্দের ভ্রমক্রমে জনৈক ধোবার সৌভাগ্য।

কলিকাতা নগরের প্রতিষ্ঠা-প্রকরণ পূর্বে তৎ প্রতিষ্ঠাতৃ ইংরাজ জাতির এদেশে আগমন বৃত্তান্ত বিবৃত করা কর্তব্য বিবেচিত হইতেছে৷ অহো! এদেশে ইংরাজদিগের সৌভাগ্যসূর্য্যের ক্রমশঃ প্রাখর্য্য বৃদ্ধির বিষয় চিন্তা করিলে চমৎকৃত হইতে হয়। যেরূপ বায়সভুক্ত বটবীজ অঙ্কুরিত হইয়া শত শত জীবের আশ্রয়দাতা সুবিস্তীর্ণ ছায়া সমন্বিত প্রকাণ্ড বৃক্ষরূপে শোভা পাইতে থাকে, যেরূপ অণুমাত্র অনল স্ফুলিঙ্গ কর্তৃক স্বল্পকাল মধ্যে ভয়াবহ ধাবদাহ আবির্ভূত হইয়া থাকে এবং হিমালয় শিখরোপরে তুষার রাশিচ্যুত রজত রেখাকার তটিনীসকল সঞ্চিত হইয়া পরিণামে কত কত শৈলভেদ পূর্বক বর্দ্ধিষ্ণুবেশে গিরিতলে পতিত হইয়া সহস্রাধিক ক্রোশ ব্যবধানে সিন্দু শাখাবৎ আকৃতি ধারণ করিতেছে, সেইরূপ ভারতবর্ষে ইংরাজদিগের আধুনিক প্রবল পরাক্রমের নিদান স্বরূপ এই বাঙ্গালাদেশে ক্ষুদ্র এক বাণিজ্যালয় স্থাপন মাত্র৷

ইংরাজী ১৬৩৪ অব্দে যে সময়ে শাহজাহান পাদশাহ ভারতবর্ষের দাক্ষিণাত্যে বিগ্রহার্থ প্রবাস করিতেছিলেন, সেই সময়ে তাঁহার এক দুহিতার বস্ত্রে একদা দৈবাৎ অনল সংলগ্ন হওয়ায় তাঁহার শরীর গুরুতররূপে দগ্ধ হইয়া যায়। সেই রাজকুমারীর যাতনা প্রতিকার নিমিত্ত সুরাটস্থ ইংলণ্ডীয় বাণিজ্য কুটি হইতে জনৈক ইংরাজ চিকিৎসক আনয়নার্থ সংবাদ প্রেরিত হইলে বোটন নামক একজন সাহেব উক্ত কার্য্যে বৃত হন। সৌভাগ্যবশতঃ তাঁহার চিকিৎসা কৌশলে নৃপনন্দিনী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করাতে সম্রাট মহোদয় কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনার্থ বোটনকে কহিলেন-“তোমার ইচ্ছানুসারে আমি পুরস্কার করিব, অতএব তোমার কি ইচ্ছা কহ।”

উদারচিত্ত স্বদেশহিতৈষী বোটন কহিলেন—“আমার আত্মস্বার্থে কিছু প্রার্থনা নাই। আমার দেশীয় লোকেরা বাঙ্গালাদেশে শুল্কবিরহে বাণিজ্য করিবার জন্য বাণিজ্যালয় স্থাপনের অনুমতি পাইলেই আপনাকে প্রভূতরূপে জ্ঞান করিব।”

সম্রাট যদিও “তথাস্তু” বলিয়া বরপ্রদান করিলেন বটে কিন্তু পর্তুগীজদিগের অত্যাচারে অনুশোচনা হওয়ায় বালেশ্বরের নিকট পিপলি নামক স্থানে বাণিজ্যকুটি নির্মাণ করিতে আদেশ বিধান করিলেন। তদনুসারে ইং ১৬৩৪ অব্দে তথায় প্রথম বাণিজ্যালয় সংস্থাপন হইল। তদনন্তর ইং ১৬৩৯ অব্দে শাহাজাহান পাদ্শাহের দ্বিতীয় পুত্র সুলতান সুজা বাংলাদেশের নবাবীপদে অভিষিক্ত হইয়া রাজধানী রাজমহলে আসিলে পর বোটন সাহেব স্বজাতীয় পক্ষ হইতে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করণার্থ উক্তস্থানে যান। দৈবাধীন অন্তঃপুরচারিণী কোন রাজ মহিলার সাংঘাতিক পীড়া হইলে বোটন সাহেবের চিকিৎসানৈপুণ্য সুবিখ্যাত হইয়া উঠায় নবাব উক্ত রোগ প্রতিকারার্থ তাঁহাকেই বরণ করিলেন। তাহাতে বোটন সাহেব স্বীয় বিদ্যাবলে ভূপতি ভামিনীকে নিরাময় করাতে সুলতান সুজা তাহার প্রতি যথেষ্ট সন্তষ্ট হইয়া বালেশ্বর এবং হুগলী নগরে ইংরাজদিগকে বাণিজ্যালয় স্থাপনে অনুমতি দান করেন।

তারপর নবাব সায়েস্তা খাঁর অধিকারকালে ইং ১৬৬৮ অব্দে ইংরাজরা ভাগীরথী বাহিয়া হুগলী নগরীর নিকট জাহাজ লইয়া যাইতে আজ্ঞাপ্রাপ্ত হন। ইতিপূর্ব্বে তাঁহারা সুলুপ যোগে দ্রব্যাদি লইয়া বাহির সমুদ্রে জাহাজ বোঝাই করিতেন। অপর প্রত্যেক নূতন নবাবের শাসনারম্ভেই তাঁহাদিগকে নূতন ফাৰ্ম্মাণ অর্থাৎ বাণিজ্য-করণের অনুমতিপত্র গ্রহণ করিতে হইত-তাহা অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য ছিল। কিন্তু নবাব সায়েস্তা খাঁর অনুগ্রহে সে দায় হইতেও তাঁহারা মুক্ত হন। এই নবাব দিল্লীতে প্রস্থান করিলে তৎসমভিব্যাহারে ইংরাজদিগের বাণিজ্য কুটির বড় সাহেব গমন করতঃ এক ফার্মাণে নিরন্তর বাণিজ্য করণের অনুমতি প্রার্থনা করেন। যদিও বিস্তর ব্যয় ও কষ্ট স্বীকার পূর্ব্বক তাহা লব্ধ হউক কিন্তু তাহা পাইয়া ইংরাজেরা এরূপ আহ্লাদিত হইয়াছিলেন যে, তাঁহারা এই উপলক্ষে তিনশতবার তোপধ্বনি করিয়াছিলেন।

ইহার পর ইষ্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানী দেখিলেন বিলাত হইতে অপরাপর অনেক ব্যবসায়ী আসিয়া বাণিজ্য করাতে তাঁহাদিগের লভ্যের ব্যাঘাত হইতে লাগিল৷ অতএব কোর্ট অব ডাইরেক্টর সভার আজ্ঞানুসারে, উক্ত প্রতিযোগীদিগের আগমন নিবারণ নিমিত্ত গঙ্গাসাগরের নিকট এক দুর্গ নিম্নাণার্থ নবাবের স্থানে অনুমতি প্রার্থনা করিয়া পাঠাইলে তিনি তাহা অগ্রাহ্য করিলেন। ইহা ব্যতীত এই সময়ে বেহার প্রদেশে রাজদ্রোহ উপস্থিত হওয়ায় পাটনাস্থ ইংলণ্ডীয় বাণিজ্যকুটির সাহেবের উপর সন্দেহ হইলে নবাব ইংরাজদিগের প্রতি বিরক্ত হইয়া এই নিয়ম করিলেন যে, তাঁহাদিগের বাণিজ্য সম্পত্তি মাত্রের মূল্য অনুসারে শতকরা ৩০০ টাকা কর দিতে হইবে। পূর্ব্বে সম্রাটের আজ্ঞানুসারে তাঁহারা বার্ষিক তিন সহস্র টাকা মাত্র দিয়া নিস্তার পাইতেন। ইংরাজদিগের প্রতি নবাবের বিরুদ্ধভাব জানিতে পারিয়া তদধীন রাজকর্মচারীরা তাঁহাদিগের প্রতি অত্যন্ত অত্যাচার আরম্ভ করিতে লাগিল। নবাবের লিখনানুসারে সম্রাট অত্যন্ত ক্রোধাপন্ন হইয়া ইংরাজদিগের প্রতি উত্তেজনাকরণে অনুমতি দেওয়ায় তাঁহারা মহাবিপদগ্রস্ত হইলেন। এই সকল সমাচার ইংলাণ্ডাধীপের শ্রবণগোচর হইলে তিনি কোম্পানীর আনুকূল্যে নিকলসন নামক জনৈক পোতপতির অধীনে ৬ শত সেনা পূর্ণ দশখানা রণপোত প্রেরণ করিলেন। ঐ সকল তরণী বাতাতিপাতে সমুদ্রের দলভঙ্গ হইয়া পড়ে; কয়েকখানা মাত্র ভাগিরথী মধ্যে প্রবিষ্ট হয়। ইহা ব্যতীত মাদ্রাজের বড় সাহেব হুগলীস্থ কুটির সাহায্যের জন্য ৪ শত পদাতিক সৈন্য প্রেরণ করিয়াছিলেন। সায়েস্তা খাঁ জলপথে এবং স্থলপথে এই সকল সমরায়োজন দেখিয়া সঙ্কুচিত চিত্তে ইংরাজদিগের সহিত সন্ধি করণের প্রস্তাব করিলেন। কিন্তু দৈবাধীন একটা সামান্য কলহোপলক্ষে তদনন্তর আকুণ্ড কুণ্ড উপস্থিত হইল। তাহা এই যে, তিনজন ইংলণ্ডীয় সৈন্য হুগলীর বাজার ভ্রমণার্থ উঠিলে নবাবের সৈন্যেরা তাহাদিগকে গুরুতর প্রহারে আহত করে। তৎ শ্রবণমাত্র ক্রমে ক্রমে সমুদয় ইংরাজ সেনা তীরস্থ হইলে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোরতর সংগ্রাম উপস্থিত হয় এবং নিকলসন সাহেব জাহাজ হইতে একাধারে গোলা বর্ষণ করিতে থাকেন; তাহাতে অন্যূন ৫ শত গৃহ ধূলিসাৎ হইয়া যায়। তন্মধ্যে গুদাম সকলও বিধ্বংস হওয়াতে ৩০ লক্ষ টাকা অপচয় হয়।

ইহা শ্রবণে নবাব কোম্পানীর পাটনা, ঢাকা ও কাশীমবাজারস্থ শাখা বাণিজ্যালয় সকল আক্রমণ পূর্বক ইংরাজদিগকে বাঙ্গালাদেশ হইতে নিষ্ক্রান্ত করণার্থ অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনাসমূহ প্রেরণ করিলেন। হুগলী কুটির বড় সাহেব ইং ১৬৮৬ অব্দের ২০শে ডিসেম্বর দিবসে সুতালুটিতে পলায়ন পূর্বক প্রাণরক্ষা করেন। যেহেতু ঐ স্থানে তৎকালে শেঠ বসাকেরা অধিবসীত করিতেন এবং তাহাদিগের সহিত সদ্ভাব থাকাতে বাণিজ্যকার্য্য স্থগিত হইবার সম্ভাবনা ছিল না। ঐ মাসের শেষে ইংরাজদিগের সহিত সন্ধি করিবার জন্য নবাব স্বীয় পক্ষ হইতে তিনজন দূত প্রেরণ করেন তাহাতে পূর্ব্ববৎ ক্ষমতা অনুসারে ইংরাজরা বাণিজ্য করিবার আজ্ঞা প্রাপ্ত হন, কিন্তু এই সন্ধি করিবার পক্ষে নবাবের আন্তরিক অভিসন্ধি এই যে, কোন মতে কালহরণ হইলে সহসা একদা ইংরাজদিগের উপর পড়িয়া তাহাদিগকে এককালীন এদেশ হইতে তাড়াইয়া দিবেন। অতএব ইং ১৬৮৭ অব্দের ফেব্রুয়ারী মাসের প্রারম্ভে হুগলীতে প্রচুর সৈন্য প্রেরণ করিলে চার্ণক সাহেব সুতালুটিতে আপনাকে নির্বিঘ্ন না বুঝিয়া স্বদলে সমভিব্যাহারে সাগরসঙ্গমে গিয়া হিজলি নামক এক অস্বাস্থ্যকর উপদ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন, এস্থানে বাস করিবার অব্যবহিত পরেই রোগোপদ্রবে অধিকাংশ ইংরাজ পরলোক গত হইলেন।

এই সময় ইংরাজদিগের এরূপ দুর্গতি হইয়াছিল যে, তাঁহারা বাঙ্গালাদেশ পরিত্যাগ করিয়া যাইতে উদ্যত হইয়াছিলেন, কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ বিলাতীয় কর্তৃপক্ষ পাদ্শাহকে স্বকীয় বল বিজ্ঞাত করণার্থ আপনাদিগের সুরাটস্থ বাণিজ্যালয় স্থগিত করিয়া উক্ত স্থানের নিকট কয়েকখানা রণতরী রাখাইয়া দিলেন। তথা হইতে যে সকল মুসলমানীয় তরণী মক্কাভিমুখে যাত্রী লইয়া যাইত, সেই সকল নাখোদা চালিত জাহাজের উপর উক্ত পোতাধ্যক্ষেরা মহা উৎপাত আরম্ভ করিলে পাদ্শাহ অগত্যা ইংরাজদিগের সহিত সন্ধি সংস্থাপন করিতে বাধ্য হইলেন৷ অতএব তাঁহার আজ্ঞানুসারে সায়েস্তা খাঁ পুনর্বার চার্ণক সাহেবকে ডাকাইয়া স্বেচ্ছানুসারে বাঙ্গালাদেশের যে কোন স্থানে বাণিজ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দিলেন, আর শতকরা ৩॥০ টাকা হারে যে শুল্ক গ্রহণের রীতি ছিল, তাহাও রহিত হইল—ইংরাজেরা উলুবেড়িয়াতে আসিয়া বাণিজ্য করিতে লাগিলেন।

কিয়ৎকাল পরেই বিশ্বাসঘাতক নবাব পুনর্ব্বার তাঁহাদিগের উপর দৌরাত্ম্য করাতে বিলাতীয় কর্তৃপক্ষ কাপ্তেন হিথ সাহেবের অধীনে প্রচুরতর সামুদ্রিক সৈন্য প্রেরণ করিলেন, যদিও এই সময়ে ইংরাজদিগের সহিত নবাবের পুনর্ব্বার সৌহাদ্দ জননের সম্ভাবনা হইয়াছিল কিন্তু হিথ সাহেবের অব্যবস্থিত চিত্ততাবশতঃ তাহা সমূলে উচ্ছিন্ন হওয়ায় ইংরাজদিগের এরূপ দুর্দ্দদশা হইল যে তাঁহারা বাঙ্গালাদেশ পরিত্যাগপূর্ব্বক প্রস্থান করিতে বাধ্য হইলেন৷ তখন সমুদ্র পথে ইংরাজ রণপোতাধ্যক্ষগণ মুসলমানীয় জাহাজ মাত্রের উপর অত্যাচার করিতে থাকিলে দিল্লীশ্বর অত্যন্ত জ্বালাতন হইয়া ১৬৮৯ অব্দে নবাব ইব্রাহিম খাঁকে লিখিয়া পাঠাইলেন, ইংরাজদিগের পূর্বাপরাধ ক্ষমা করা গেল, তাহাদিগের ৩০০০ সহস্র টাকা মাত্র বার্ষিক কর লইয়া পুনর্বার বাণিজ্য করিবার ক্ষমতা দিবে। তদানুসারে সন্ধি হইলে ইং ১৬৯০ অব্দের ২৪শে আগস্ট দিবসে জন চার্ণক সাহেব সুতালুটিতে পুনর্বার উত্তীর্ণ হইয়া কলিকাতা নগর প্রতিষ্ঠা করিলেন। সুতরাং ঐ দিবস হইতেই কলিকাতা নগর নামে প্রসিদ্ধ হইয়া আসিতেছে। অতএব দেড়শত বৎসরাধিক হইল এই মহারাজধানী প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে৷ উক্ত শুভকার্য্যের দুই বৎসর পর মহাত্মা প্রতিষ্ঠাতা চার্ণক সাহেব লোকান্তরিত হন। অদ্যাপি তাঁহার সমাধি সেণ্ট যন্স চর্চ অর্থাৎ পাতরিয়া গীর্জায় বর্তমান রহিয়াছে। ইহার নামেই চার্ণক গ্রামের নামকরণ হইয়াছে।

এক্ষণে এই এক প্রশ্ন উত্থাপিত হইবার সম্ভাবনা যে, ওলন্দাজ, ফরাসীস্ ও দীনেমার প্রভৃতি অপরাপর ইউরোপীয়েরা গঙ্গার পশ্চিম পারে সকলেই নগর প্রতিষ্ঠা করেন কিন্তু ইংরেজেরা কি জন্য পূর্ব্বপারে স্থান গ্রহণ করিলেন? পশ্চিম পারে নদীর সুমধুর সমীরণ প্রবাহিত ও প্রভাতে সূর্য্যোদয়ের শোভা বিলোকিত হয়-পূর্ব পারে পূর্বোক্ত ত্বগেন্দ্রিয় ও দর্শনেন্দ্রিয়ের সুখলাভ হয় না৷ কিন্তু পূর্ব্বপারে কলিকাতা স্থাপনের ভিন্ন ভিন্ন তিন কারণ প্রদর্শিত হইয়াছে। প্রথম-পশ্চিম পারাপেক্ষা পূর্বপারে ভাগীরথীর গভীরতা, দ্বিতীয় শেঠ বসাকদিগের অনুরোধ এবং তৃতীয়—মহারাষ্ট্রীয়েরা গঙ্গার পূর্বপারে আসিত না।

অনেক স্থলে সামান্য একটি ভ্রমসূত্রে মহাত্মা কলম্বস পৃথিবী পরিধির অসম্যক-জ্ঞানজনিত ভ্রমে নব ভূখণ্ড প্রকাশে উৎসাহী হন। আটলান্টিক সমুদ্রের প্রকৃত পরিসরের পরিজ্ঞান থাকিলে তিনি তৎকালে কদাচই উক্ত সাহসিক ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইতেন না। যদি মহদ্বিষয়ের সহিত ক্ষুদ্র বিষয়ের তুলনা সাযুজ্য হয়, তবে কলিকাতা নগরের প্রথমাবস্থায় এইরূপ এক ভ্রমের কথা উত্থাপন করা যাইতে পারে। তাহা এই যে, ইংরাজরা প্রথমতঃ কলিকাতার নীচে ভাগীরথীতে জাহাজ লাগাইয়া শেঠদিগের স্থানে একজন দ্বিভাষী প্রার্থনা করিয়া পাঠান। মাদ্রাজে দ্বিভাষী শব্দের অপভ্রংশ “দোবাস” শব্দ সুতরাং সাহেবরা “দোবাস” চাই বলিয়া পাঠাইলে এই অশ্রুত অপূর্ব শব্দের অর্থ বুঝিতে না পারিয়া তন্তবায় মণ্ডলী মহাচিন্তিত হইলেন। পরে তাঁহাদিগের মধ্যে একজন প্রাচীন চাই বহুক্ষণ বুদ্ধি- চালনাপূর্বক কহিলেন যে, ইংরাজেরা জনৈক “ধোবা” চাহিয়া পাঠাইয়াছেন। অতএব উক্ত বৃদ্ধের বচন অনুসারে তাঁহারা একজন ধোবাকে সাহেবদিগের নিকট প্রেরণ করিলেন। ধোবা জাহাজে উত্থানমাত্র সাহেবেরা মহাপুলকিত হইয়া তোপধ্বনি পূর্ব্বক তাহাকে মহাসমাদরে গ্রহণ করতঃ রাশি রাশি স্বর্ণমুদ্রা দিয়া বিদায় করিলেন। ঐ ধোবা অত্যন্ত চতুর বুদ্ধিজীবী ছিল, সে অতি অল্প কালের মধ্যে ইংরাজদিগের সমুদয় কার্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করায় তাঁহারা তাহার উপর সন্তুষ্ট হইলেন এবং রজকপুত্র বিছুকাল পরে কলিকাতার সর্বপ্রধান ধনী হইয়া উঠে। ঐ সৌভাগ্যশালী রজকের নাম—পাতরিয়াঘাটার উত্তরাংশে রঘু-সরকারের নামে যে বর্ম বিখ্যাত আছে—ধোবা ঐ রঘু সরকারের পিতামহ ছিল। এই কোটিশ্বর রজক উক্ত স্থানে এক অট্টালিকা নিৰ্ম্মাণপূর্বক বসতি করে কিন্তু শেঠদিগের বাটীর সম্মুখে ঐ অট্টালিকার সিংহদ্বার নির্মিত হইলে প্রভাতে রক্ষকের মুখদেখা অশুভকর বিধায় মেয়র আদালতে শেঠেরা আপত্তি উপস্থিত করেন। তাহাতে মেয়র সাহেব, ধোবাদিগের ইতরত্ব বিষয়ে সংশয় উপস্থিত করিলে শেঠেরা বলেন—"সাহেব! তোমার বেয়ারাগণ যদি ঐ ধোপার পাল্কী বহন করে তবে তাহাদের ভদ্রত্ব বিরুদ্ধে আমাদের কোন আপত্তি নাই৷” তাহাতে মেয়র সাহেব স্বীয় বেয়ারাদিগকে রজকনন্দনের পাল্কী বহিতে কহিলে তাহারা অস্বীকার করাতে বিচারপতি ধোবাদিগের নীচত্ব বিষয়ে সংশয় শূন্য হইয়া উক্ত সদর দরজা বন্ধ করিয়া বাটির পশ্চাদ্ভাগে দম্য পথ প্রস্তুত করিবার অনুজ্ঞা দেন।কিন্তু এখন যদিও বাহকেরা রজক বহনে অস্বীকার করুক তথাপি রাজদ্বারে উক্ত প্রকার অবিচার কখনই হইবার সম্ভাবনা নাই।


তৃতীয় অধ্যায়

দুর্গ নির্মাণ—কলিকাতার সৌভাগ্যবৃদ্ধি—মুর্শিদকুলি খাঁর দৌরাত্ম্যকলিকাতার পার্শ্ববর্তী ৩৮ খানা গ্রাম পাইবার কল্পনা-ইংরাজদিগের প্রতি সুজাউদ্দিনের আচরণ-কলিকাতা নগরীর সাহেবদিগের ভোগাতিশয্য—বড় ঝটিকা এবং ভূমিকম্প—মহারাষ্ট্রীয়দিগের উৎপাত-মহারাট্টাডিচ নামক পরিখা খনন-সিরাজউদ্দৌল্লার সহিত ইংরাজদিগের প্রথম বিবাদগভর্ণর ড্রেক সাহেব-কলিকাতার বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দৌল্লার আগমন।

যেরূপ প্রাবৃষ্টকালীন ঘোরতমা অমা নিশায় পথ ভ্রমণ কালে পান্থগণ ক্ষণপ্রভার অনিশ্চিত ক্ষণিক জ্যোতির আশ্রয় গ্রহণে গম্য পথ প্রাপ্ত হন কলিকাতার পুরাকৃত লিখিতে আমাদেরও সেইরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছে, যেহেতু ঘটনাসমূহ সুশৃঙ্খল রূপে প্রাপ্তব্য নহে। একটি বিষয়ের আনুপূর্ব্বক বৃত্তান্ত লাভ হইবার পর তৎক্ষণাৎ সংঘটিত বিষয়ের স্থূল স্থূল বিবরণও পাওয়া যায় না। তথাপি আমরা সাধ্যানুসারে সেই সকল অসম্পূর্ণ ঘটনারূপ কুসুম যোগে এই প্রবন্ধমালা গাঁথিতে প্রবৃত্ত হইলাম।

ইং ১৬৯৫ অব্দে ইংরাজদিগের সৌভাগ্যক্রমে এমন এক ঘটনা উপস্থিত হইল, যাহাতে তাঁহাদিগের বহুকালের সঞ্চিত বাসনা সম্পূর্ণ হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা হইয়া উঠিল অথচ সেই অভিলাষ সিদ্ধি পক্ষে তাঁহারা পূর্ব্বে বিস্তর উপাসনা ও প্রচুর উৎকোচ প্রদানে সম্মত ছিলেন। সেই আন্তরিক বদ্ধমূল কামনা এই যে, আপনাদিগের বাণিজ্যালয়ের চতুদ্দিক গড়বন্দী করিয়া বাস করেন। এইবার সেই কামনা সফল হইবার দিন সন্নিকট হইল, চেটুয়া বরদার ভূম্যধিকারী শোভাসিং উড়িয্যা দেশীয় রহিম খাঁ নামক আফগানের সহিত সমবেত হইয়া বর্দ্ধমানের রাজাকে অধিকারচ্যুত করিয়া দেশ মধ্যে মহা অরাজকতা উপস্থিত করিল। দুষ্টদিগকে দমন করিবার জন্য যশোহরের ফৌজদার আজ্ঞাপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন৷ কিন্তু উক্ত সেনাপতি হুগলীতে উপস্থিত হইয়া দুষ্ট দলের প্রাবল্য দর্শনমাত্র সদলবলে প্রস্থান করিতে বাধ্য হইলেন। এই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ইউরোপীয় বণিকদল আপনাপন বাণিজ্যালয় রক্ষার্থ সৈন্যরক্ষা ও গড়বন্দী করিবার নিমিত্ত নবাবের স্থানে অনুমতি প্রার্থনা করিলে তিনি তাঁহাদিগকে প্রয়োজনমত অস্ত্রশস্ত্র রাখিতে অনুমতি দেন, কিন্তু ইউরোপীয়েরা স্বেচ্ছাপূর্বক সে অনুমতি বিস্তীর্ণ অর্থে গ্রহণ পূর্বক আপনাপন স্থান গড়বন্দী করিতে লাগিলেন। অতঃপর ইংরেজরা উক্ত আদেশ পাইবার পরেই আপনাদিগের বাণিজ্য কুটির চতুদ্দিকে পরিখা প্রাচীরাদি নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং যে পর্য্যন্ত তাহার কার্য্য্য সমাধান হইল সে পর্য্যন্ত দিবারাত্র আপনাদিগের অধীনস্থ সমুদয় লোককে সেই কার্যে নিযুক্ত রাখিলেন। ঐ দুর্গ পূর্বে পশ্চিমে লালদিঘি হইতে ভাগীরথীর তীর পর্য্যন্ত এবং উত্তর দক্ষিণে ক্লাইভ স্ট্রীট হইতে ঐ দিঘির উত্তর ধার পর্যন্ত বিরাজমান ছিল। ইংলণ্ডাধিপতি তৃতীয় উইলিয়মের রাজত্ব কালে ঐ দুর্গ নির্মিত হওয়ায় ফোর্ট উইলিয়ম নামে তাহা প্রতিষ্ঠিত হয়-ঐ নামে নূতন দুর্গেরও নামকরণ হইয়াছে। প্রচীন দুর্গ এরূপ সুদৃঢ়রূপে নির্মিত হয় যে ১৮১৯ অব্দে কাষ্টম হাউসের কারণ যখন তাহা ভাঙ্গিতে আরম্ভ হয় তখন কত কত গাঁতি ও সাবল চূর্ণ হইয়া যায় এবং পরিশেষে বারুদযোগে তাহা উড়াইয়া দিবার প্রয়োজন হইয়াছিল। সে সময়ে গুড়, পাট ও চূণ সুরকি যোগে এরূপ এক সুকঠিন মশলা প্রস্তুত হইত যে তদ্ারা কোন বাটী গ্রথিত হইলে তাহা বজ্রবৎ দুর্ভেদ্য হইয়া যাইত। এই দুর্গ-রক্ষার্থ প্রথমে ২০০ মাত্র সৈন্য রক্ষিত হইয়াছিল।

ইং ১৭০০ অব্দে কলিকাতা নগরের এরূপ সৌভাগ্য বৃদ্ধি হইল যে, অনেক ধনবান হিন্দু পরিবার আসিয়া তথায় বসতি করিতে লাগিলেন, কারণ সে সময়ে ইংরাজদিগের আশ্রয়ে বাস করিয়া লোক অধিক সুখী হইত; কোন প্রকার অত্যাচারের আশঙ্কা থাকিত না। কোম্পানী সুতালুটি, গোবিন্দপুর এবং কলিকাতা এই তিনখানি গ্রাম প্রাপ্ত হওয়ায় গঙ্গাতীরে প্রায় দেড় ক্রোশাধিক তাঁহাদের অধিকার বিস্তৃত হয়। কলিকাতার শ্রীবৃদ্ধি দেখিয়া হুগলীস্থ ফৌজদারের ঈর্ষানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিয়াছিল, সে জন্য তিনি নূতন নগরে একজন কাজী প্রেরণে উদ্যত হইলে ইংরাজেরা উপযুক্ত উৎকোচ প্রদান পূর্বক ফৌজদারের মুখ বন্ধ করিলেন।

অনন্তর মুর্শিদকুলি খাঁর অধিকারকালে ইংরাজেরা পুনর্বার প্রপীড়িত হইতে লাগলেন। ঐ নবাব দেখিলেন যে বাঙ্গালাদেশের সৌভাগ্য বৃদ্ধির মূলীভূত কারণ ইউরোপীয় বিশেষতঃ ইংরাজদিগের বাণিজ্য কার্য্যের প্রচুরতা৷ সেজন্য তিনি মুসলমানদিগকে বাণিজ্য ব্যবসায় উৎসাহ প্রদান পূর্ব্বক ইংরাজদিগের উপর অত্যাচার করিতে লাগিলেন। ইংরাজেরা নবাব সুজা খাঁ ও দিল্লীশ্বর আওরংজেবের স্থানে যে সকল ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, মুর্শিদকুলি খাঁ সেই সব হরণ-পূর্বক এদেশীয় বণিকদিগের তুল্য শুল্ক অথবা ভূরি ভূরি উপটৌকন প্রদানে তাঁহাদিগকে বাধ্য করিলেন৷ কোম্পানি ইহাতে ক্রুদ্ধ হইয়া দিল্লীশ্বরের নিকট আদ্দাস বিজ্ঞাপনের নিমিত্ত আপনাদের কর্মচারীগণের মধ্যে দুইজন উপযুক্ত লোককে দৌত্যে বরণপূর্ব্বক পাঠাইলেন। ঐ দূতদিগের সঙ্গে খোজা সরহান্দ নামক একজন সুযোগ্য আর্মানী ও চিকিৎসাকার্য্য নির্বাহ জন্য ডক্টর উইলিয়ম হ্যামিন্টন সাহেব গমন করেন। খোজা সরহান্দ এদেশীয় ভূপতিদিগের সহিত কিরূপ ব্যবহার করিতে হয় তাহা সুন্দররূপে অবগত ছিলেন। দিল্লীশ্বরকে উপটৌকন প্রদান নিমিত্ত কোম্পানী তিন লক্ষ টাকা মূল্যের উত্তম উত্তম রত্ন ক্রয় করিয়া পাঠান। সরহান্দ দিল্লীতে তাহার মূল্য দশ লক্ষ টাকা বলিয়া লিখিয়া পাঠাইলে ফিরোজ শাহ প্রত্যেক স্থানের শাসন কর্তাদিগের প্রতি আদেশ করিলেন ইংরাজ দূতেরা যাহাতে নির্বিঘ্ন দিল্লীতে আসিয়া উত্তীর্ণ হন, সকলে এমন প্রহরী নিযুক্ত করিয়া দিবেন।

মুর্শিদকুলি খাঁ দেখিলেন ইংরাজরা তাঁহার শক্তি উলঙ্ঘন করিবার বিলক্ষণ পন্থা প্রস্তুত করিতেছে। সেজন্য তাহাদের চেষ্টা বিফলীকৃত করিবার জন্য সাধ্যানুহারে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। বোধহয় তাঁহার উদ্যোগ সফল হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা হইয়াছিল। কিন্তু দৈবাধীন এক সুঘটনাক্রমে তাহা ব্যর্থ হইয়া গেল৷ এই সময়ে দিল্লীশ্বরের সহিত রাজা অজিত সিংহের কন্যার পরিণয় ঘটিত মহা আড়ম্বর উপস্থিত হয়, কিন্তু ফেরোজ শাহ পীড়িত হওয়ায় তাহা স্থগিত হইল। হাকিম সাহেবেরা সম্রাটকে নিরাময় করিতে অক্ষম হইলেন। পরিশেষে খাঁ দৌরাণের পরামর্শ মতে ইংরাজ দূতদিগের সহিত আগত ডক্টর হ্যামিল্টনের চিকিৎসা গ্রাহ্য করিলে অতি অল্পকাল মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যলাভ করিয়া সম্রাট উক্ত চিকিৎসককে পুরস্কার প্রার্থনা করিতে বলিলে হ্যামিল্টন সাহেব উদারাত্মা বোটনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ পূর্বক কহিলেন, ইংরাজ দূতগণ যে সকল প্রার্থনা লইয়া আসিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণ হইলে তিনি আপনাকে যথেষ্ট পুরস্কৃতজ্ঞান করিবেন। দিল্লীশ্বর তাহাতে সম্মতি বিজ্ঞাপন করিলেও ছয়মাসকাল উক্ত বিবাহের ধুমধামে কাল বিগত হওয়ায় দূতদিগের মানস সিদ্ধ হইল না।

প্রার্থনা পত্রের মৰ্ম্ম এইরূপ যে (১) কলিকাতার বড় সাহেবের স্বাক্ষরিত ছাড়পত্র দৃষ্টে নবাবী কর্মচারীগণ কোম্পানীর বাণিজ্য দ্রব্যাদির তল্লাসী না লইয়া ছাড়িয়া দিবেন। (২) মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল হইতে কোম্পানী মাসের মধ্যে তিনদিন আপনাদিগের মুদ্রা প্রস্তুত করাইয়া লইবেন। (৩) ইউরোপীয় বা এতদ্দেশীয় কোন ব্যক্তি কোম্পানীর নিকট ঋণী থাকিলে নবাব বড় সাহেবের প্রার্থনা মতে তাহাকে ধরিয়া কলিকাতায় চালান দিবেন। (৪) কলিকাতার চতুঃপার্শ্ববর্তী ৩৮ খানা গ্রাম ক্রমে কোম্পানী সনন্দ প্রাপ্ত হইবেন। এই সকল প্রার্থনা পক্ষে মন্ত্রিগণ বিস্তর আপত্তি উপস্থিত করিলেও পরিশেষে তাহা গ্রাহ্য হইল। তারপর দূতেরা কলিকাতায় প্রত্যাগমন নিমিত্ত যাত্রাকালে শুনিলেন সনন্দপত্রে সম্রাট স্বাক্ষর করেন নাই৷ সচিববর তাহাতে নামাঙ্কিত করিয়াছেন। ইহা শুনিয়া দূতগণ পুনঃ পুনঃ আবেদন করিলেও দুই বৎসর পর্যন্ত কোন উত্তর না পাইয়া দিল্লীতে বাস করিতে লাগিলেন। অবশেষে সুরাটের বড় সাহেব উক্ত নগর পরিত্যাগ পূর্বক মুসলমান তীর্থ তরণীর উপর অত্যাচার করিবার জন্য বোম্বাই যাত্রা করিবামাত্র সম্রাট প্রাগুক্ত প্রার্থনায় নাম স্বাক্ষর করিতে আর কালবিলম্ব করিলেন না।

অনন্তর ইং ১৭০৭ অব্দে ইংরাজ দূতেরা জয়ডঙ্কা বাজাইয়া কলিকাতা উপস্থিত হইলে মুর্শিদকুলি খাঁ বিরাগানলে দ ীভূত হইতে লাগিলেন। ইংরাজেরা উক্ত ৩৮ খানা গ্রাম প্রাপ্ত হইলে গঙ্গার উভয় পারে ৫ ক্রোশ করিয়া তাঁহাদিগের অধিকার বৃদ্ধি হইবে৷ ইহাতে এক প্রকারে বাঙ্গালাদেশের সমুদয় বাণিজ্য কার্য্যের উপর তাঁহাদিগের কর্তৃত্ববৃদ্ধি হইবার সম্ভাবনা। নবাব ইংরাজদিগের অন্যান্য অভিনব ক্ষমতার বিষয়ে অনভিমত মাত্র প্রকাশ করিলেন না কিন্তু যাহাতে তাঁহারা কোনরূপে ঐ ৩৮ খানা গ্রাম ক্রয় করিতে না পান তজ্জন্য সেই সেই স্থানে ভূম্যধিকারীদিগকে লিখিয়া পাঠাইলেন৷ ইংরাজদিগকে কেহ যদি সূচ্যগ্রপরিমিত ভূমি বিক্রয় করেন তবে তাঁহাকে তিনি কখনও ক্ষমা করিবেন না। সুতরাং এই প্রশাসন বাক্যে ভূম্যধিকারীরা ভীত হওয়ায় ইংরাজেরা একখানি গ্রামও ক্রয় করিতে পারিলেন না। কিন্তু তাঁহারা আর আর যে সকল ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন সেগুলি অত্যন্ত হিতকর হওয়ায় কলিকাতা বাসীগণের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি দেখিয়া অন্যত্র হইতে দলে দলে লোকসমূহ আসিয়া তথায় বসতি করিতে লাগিল—তাহাতে অতি অল্প কালের মধ্যে কলিকাতা সর্ব বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বাণিজ্য স্থান হইয়া উঠিল।

ইং ১৭০৯ অব্দে নবাব সুজাউদ্দিনের অধিকার কালে ইংরাজদিগের সৌভাগ্যসূর্য্য কিছুকালের জন্য অশুভ মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল। হুগলীর ফৌজদার অন্যায় পূর্বক তাঁহাদের একখানা রেশমের নৌকা আটক করিলে তাঁহারা একদল সৈন্য প্রেরণপূর্ব্বক তাহা উদ্ধার করিয়া লইয়া আসেন। নবাব এই সংবাদ শ্রবণমাত্র দেশীয় লোকমাত্রকে কলিকাতায় শস্য বিক্রয় করিতে নিষেধ করিয়া পাঠাইলেন, সুতরাং ইংরেজরা মহা বিপন্ন হইয়া অগত্যা বিশিষ্ট রূপ মুদ্রাপুষ্প দ্বারা তাঁহার পূজা করিলে তিনি ক্ষান্ত হন।

এই সময় কলিকাতাস্থ ইংরাজদিগের ভোগাতিশয্যের পরিসীমা ছিল না। তাঁহাদিগের প্রধান প্রধান কর্মচারী বেতন ৩০০ মুদ্রার অধিক না হইলেও স্বকীয় গোপনীয় বাণিজ্য দ্বারা তাঁহারা এরূপ সম্পন্ন হইয়াছিলেন যে, তাঁহারা প্রকৃত রাজা রাজড়ার ন্যায় ধুমধামের সহিত বিলাস বিহ্বলতায় কালক্ষেপ করিতেন। বড় সাহেব দূরে থাকুন, তাঁহার অধীন কর্মচারীরাও ৬ ঘোড়ার গাড়ী আরোহণে সমীরণ সেবন করিতেন এবং ভোজনে বসিলে তাঁহাদিগের সম্ভ্রমনিমিত্ত সুমধুর বাদ্যোদ্যম হইত। ইহার অনেক বৎসর পরেও তাঁহাদিগের সৌখিনতার কথা শুনিলে চমৎকৃত হইতে হয়। ইং ১৭৭৪ অব্দে কোন সাহেব লেখেন, কোম্পানীর কেরানীরা বেতন ও অন্য উপার্জন দ্বারা বার্ষিক দুই সহস্রটাকা না হইলেও সকলের সঙ্গে সঙ্গে এক একজন হুকাবদ্দার থাকে, তাহাদিগকে মুহুর্মুহুঃ আলবোলা প্রস্তুত রাখিতে হয়—বিশেষতঃ তাঁহাদিগের অন্তঃপুরচারিণী বিলাসিনীসমূহ রক্ষায় কত অর্থ ব্যয় হইয়া থাকে তাহা চিন্তা করিলে আশ্চর্য্য বোধ হয়া এই সকল মহামহিমদিগের এদেশীয়, বিশেষতঃ মুসলমান কর্মচারীদের বংশধরেরা এখন আপনাদিগকে বড় মানুষ বলিয়া অভিমান করেন।

কার্তিকী ঝটিকা

ইং ১৭৩৯ অব্দে ১১ই অক্টোবর রজনীতে গঙ্গাসাগরে এক ভয়ানক ঝটিকা উদয় হইলে উর্দ্ধে একশত ক্রোশ দূরে অবস্থিত প্রদেশ পর্য্যন্ত তাহার প্রবল পরাক্রম অনুভূত হইয়াছিল৷ ইহাতে কলিকাতার যেরূপ দুর্গতি হইয়াছিল তাহা বর্ণনা করা অসাধ্য। এই সময়ে আবার একটা ঘোরতর ভূমিকম্প সংঘটিত হইয়া নগরের শ্রীহীনতার অবশেষ মাত্র রাখে নাই। দুই শত বাটী বিধ্বংস হয় ও কলিকাতাস্থ গীর্জার শোভনতম চূড়া ভগ্ন না হইয়া ভূগর্ভে প্রবিষ্ট হইয়া যায়৷ জাহাজ সুলুপ ও বোট প্রভৃতিতে লইয়া অন্যূন বিংশতি সহস্র তরণী গঙ্গামগ্ন অথবা ভগ্নাবস্থা প্রাপ্ত হয়। ভাগীরথীতে ৯ খানা জাহাজের মধ্যে ৮ খানা জাহাজ আরোহীগণ সমেত বিনাশ পায়। দ্বি-সহস্র মণ ভারবাহী তরণীসমূহ নদী হইতে এক ক্রোশ অন্তরে বৃক্ষাদির উপর দিয়া চলিয়া গিয়াছিল। অন্যূন তিন লক্ষ লোক নিহত হয়। ভাগীরথীর জল স্বাভাবিক অপেক্ষা ৪০ হস্ত উর্দ্ধে উঠিয়াছিল। এই দুর্ঘটনার পরবৎসর দুর্ভিক্ষ আসিয়া উপস্থিত হইল। কলিকাতার বড় সাহেব সহৃদয়তা-পূর্বক এদেশীয় দুঃখী লোকদিগের পরিত্রাণকল্পে সমুচিত মত সাহায্য প্রদান করিয়াছিলেন। এক বৎসরের খাজনা মাফ হয় ও কৃষিকার্য্যের জন্য দাদন দেওয়া হয়। তণ্ডুলের উপর যে মাশুল নির্ণীত ছিল, তাহাও রহিত হইল। নিতান্ত দুঃখীদিগকে ডাকাইয়া আনাইয়া সাহেবেরা খাদ্য বিতরণ করিতেন।

ইং ১৭৪২ অব্দেমহারাষ্ট্রীয়েরা ভাস্কর পণ্ডিতের অধীনে বাঙ্গালাদেশে আসিয়া মহা উৎপাত আরম্ভ করিল। আজিও বর্গীয় হাঙ্গামার কথা উঠিলে লোকের হৃদয় কম্পিত হয়। দুষ্টেরা বলেশ্বর হইতে রাজমহল পর্য্যন্ত সমুদয় প্রদেশ উৎসন্ন করিয়া কলিকাতাভিমুখে অগ্রসর হইলে ইংরাজেরা আপনাদিগের দুর্গের পুনঃসংস্কার ও নগরের চতুর্দ্দিদকে এক পরিখা খনন করিতে লাগিলেন। ঐ পরিখার ব্যবধান ৩০০ ক্রোশ অবধারিত হইয়াছিল। কিন্তু মহারাষ্ট্রীয়দিগের দৌরাত্ম্য উপশম হইলে সেই কার্য্য পরিত্যক্ত হয়। এখনও শ্যামবাজারের পুলের নীচে তাহার চিহ্ন দৃষ্ট হইয়া থাকে এবং প্রকৃত পরিখা না থাকিলেও “মহারাষ্ট্রাডিচ্” অর্থাৎ মহারাষ্ট্রীয় পরিখা এই কথা অধুনা সকলের হৃদয়ে জাগরূক আছে।

ইং ১৭৫৬ অব্দের ১০ই এপ্রিল দিবসে সিরাজউদ্দৌল্লা নবাবী পদ ধারণ পূর্বক স্বীয় প্রতিযোগী ঢাকার নেওয়ারিশ মহম্মদের মৃত্যুর পরে তৎবনিতার সর্বস্থ হরণ করিয়াও ক্ষান্ত হইল না। নেওয়ারিশের সহকারী রাজা রাজবল্লভ বিপুল বিভববিশিষ্ট হওয়ায় সিরাজউদ্দৌল্লা তাঁহাকেও নিঃস্ব করণার্থ মুর্শিদাবাদে কারাবদ্ধ করিয়া রাখিল৷ রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস সুচতুরতা পূর্বক সমুদয় সম্পত্তি নৌকায় বোঝাই করিয়া সপরিবারে গঙ্গাসাগরে অথবা পুরুষোত্তম তীর্থে যাইবার ছলে প্রস্থান পূর্বক ১৭ই মার্চ দিবসে কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কলিকাতার বড় সাহেব তাঁহাকে সমাদর পূর্বক গ্রহণ করিয়া আশ্রয় দিলেন। কৃষ্ণদাস স্বীয় পিতার বন্ধনদশা বিমোচন সমাচার না পাওয়া পর্য্যন্ত কলিকাতায় থাকিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইলেন। রাজবল্লভের কুবের তুল্য ধন রাশি হস্তচ্যুত হওয়ায় সিরাজউদ্দৌল্লা মহাক্রোধাপন্ন হইয়া কলিকাতায় দূত প্রেরণ পূর্বক কৃষ্ণদাসকে তাহার হস্তে প্রদান করিবার আদেশ পাঠাইলেন৷ ঐ দৌত্যে মেদিনীপুরের ভূম্যধিকারী রাজরাজের ভ্রাতা নারায়ণ সিংহ নিযুক্ত হইয়া আসেন কিন্তু সে ছদ্মবেশে কলিকাতায় প্রবেশ করাতে ড্রেক সাহেব তাহাকে নগর হইতে দূরীভূত করিয়া দিলেন। মুসলমানদিগের অসৌভাগ্য নিশাগম এবং ইংরাজদিগের সৌভাগ্য সূর্য্যোদয়ের এই ঘটনাকে এক প্রকৃষ্ট কারণ বলিয়া গণ্য করিতে হইবে।

তাহার পর ইউরোপে ফরাসীয়দিগের সহিত ইংরাজদিগের বিগ্রহ উপস্থিত হইলে কলিকাতার গভর্ণর সাহেব ফরাসডাঙ্গার ফরাসীদিগের আক্রমণ নিবারণ নিমিত্ত ও পুনর্বার সুদৃঢ়রূপে কলিকাতার দুর্গ মেরামত করিতে আরম্ভ করেন। সিরাজউদ্দৌল্লা তাহা শ্রবণে একেবারে জ্বলিতাঙ্গ হইয়া ঐ কার্য্য রহিত পূর্ব্বক অবিলম্বে কৃষ্ণদাসকে সমর্পণ করিতে লিখিয়া পাঠাইল কিন্তু ড্রেক সাহেব সেই উভয় আদেশ অবজ্ঞা করিয়া পত্রোত্তর প্রেরণ করিলেন। সিরাজউদ্দৌল্লা সেই সময়ে পূর্ণিয়াতে সোকৎজঙ্গের সর্বনাশ করিবার জন্য রাজমহলের নিকট সসৈন্যে গঙ্গাপার হইতেছিল৷ ড্রেক সাহেবের পত্র প্রাপ্তি মাত্র তাহার শরীরে যেন কোটি কোটি বিষধর এককালে দংশন করিল। অতএব পূর্ণিয়া গমন ব্রত উদযাপন পুরঃসরঃ সেই সৈন্য সিন্ধু সমভিব্যাহারে কলিকাতা অভিমুখে দ্রুতবেগে চলিয়া আসিল। আগমন কালে পথিমধ্যে ইংরাজদিগের কাশীমবাজারের কুটি লুট করিয়া সেখানকার সাহেবদিগকে বন্দীদশায় নিক্ষেপ করে। এই সময়ে ওয়ারেন হেষ্টিংশ সাহেবকে কাশীমবাজার নিবাসী কান্ত নামক একজন তৈলিক আশ্রয় প্রদান করাতে পরে তাহার সৌভাগ্যের সীমা থাকিল না। ঐ কান্ত পরে কান্তবাবু খ্যাতি লাভ করে ও তৎপুত্র লোকনাথ হেষ্টিংশের অনুগ্রহে রাজোপাধি প্রাপ্ত হয়।

ইংরাজেরা গত ৬০ বৎসর পর্য্যন্ত নির্বিঘ্নে কলিকাতায় এক প্রকার নিশ্চিন্ত ভাবে থাকা হেতু দুর্গের প্রাচীর প্রকারাদি ভগ্নাবস্থায় পতিত হয়। দুর্গ মধ্যে ১৭০ জন মাত্র সৈন্য থাকিত-তন্মধ্যে আবার ৬০ জন ইউরোপীয় এবং অবশিষ্ট এদেশীয় লোক। বারুদ পুরাতন হওয়ায় অকৰ্ম্মণ্য প্রায় ও তোপসমূহে মর্চা ধরিয়া গিয়াছিল। সিরাজউদ্দৌল্লা ৪০/৫০ সহস্র সৈন্য ও তদুপযুক্ত তোপ সমভিব্যাহারে এই নগর আক্রমণ করিতে আসিয়াছে ইহা শ্রবণ মাত্র ইংরাজেরা সশঙ্কিত হইয়া বারম্বার সন্ধি প্রার্থনা ও ভূরি ভূরি অর্থ উপটৌকন প্রদান করিবার ইচ্ছা জানাইয়া পাঠাইলেন। নবাব সে সকল কথা কিছুমাত্র না শুনিয়া ইংরাজদিগের একেবারে উচ্ছিন্ন করিবার মানসে ক্রমশঃ অগ্রসর হইতে লাগিল। ১৬ই জুন দিবসে সর্বাগ্রবর্তী সেনা চিৎপুরে পৌঁছিল৷ ঐ স্থানে ইংরাজেরা পূর্বাহ্নে এক মুর্চা বান্ধিয়া রাখিয়াছিলেন। সেখান হইতে গোলাবর্ষণ আরম্ভ করিলে নবাবের সেনা ব্যতিব্যস্ত হইয়া দমদমায় যাইয়া শিবির সংস্থাপন করিল।


চতুর্থ অধ্যায়

কলিকাতা নগর আক্রমণ—ব্ল্যাকহোল নামক কারাগার-হলওয়েল সাহেবের নিষ্কৃতি-কর্ণেল ক্লাইভ ও এডমিরাল ওয়াট্সন কর্তৃক কলিকাতার পুনরুদ্ধার-সিরাজউদ্দৌল্লার পুনর্বার ইংরাজের বিরুদ্ধে আগমন ও পরাজয়।

১৭ই জুন দিবসে নবাবের সেনা কর্তৃক কলিকাতা নগর আক্রান্ত হয়।ইংরাজেরা আত্মরক্ষার জন্য বাগবাজারে উমাইচাঁদের বাগানে, হালসীর বাগানের নীচে, লাল দিঘির পূর্বধারে, পার্ক অর্থাৎ মৃগ শালার পূর্ব দক্ষিণ বাগে ও ছোট দিঘির ধারে এক এক করিয়া পরিখা খনন ও মুর্চা স্থাপন করিয়াছিলেন, কিন্তু এ সকল আয়োজন প্রাবৃট কালের স্রোতস্বতীর মুখে বালুকার সেতুবন্ধবৎ ব্যর্থ হইয়া গেল৷ প্রতি মুর্চায় ৫/৭ জন করিয়া প্রহরী রক্ষিত হইয়াছিল। নবাবের সৈন্য বাগবাজারে স্থাপিত মুর্চার গোলার আঘাতে জর্জরীভূত হওয়ায় সে দিক দিয়া নগর আক্রমণ না করিয়া ১৮ই দিবসে হালসীর বাগানের পূর্ব দিক হইয়া বৈঠকখানায় উত্তীর্ণ হইল। ইংরাজেরা দুর্গের নিকটে যে সকল পরিখা খনন করিয়াছিলেন, তাহাতে শত্রুদিগের অপকার না হইয়া উপকারই হইল। কারণ খনিত মৃত্তিকা রাশি পর্বত প্রমাণ স্তূপে স্তূপে রক্ষিত থাকাতে দুর্গ হইতে যে সকল গোলা বর্ষিত হইয়াছিল, তাহা শত্রুদিগের উপর পতিত হইয়া তেমন কিছু অনিষ্ট করিতে সক্ষম হয় নাই। মুসলমানেরা প্রাচীরের বহির্ভাগস্থিত বাটী সকল অধিকার করিয়া তথায় কামান তুলিয়া এমন অগ্নিবৃষ্টি করিতে লাগিল যে, দুর্গস্থ প্রাণী মাত্রে কেহ স্ব স্ব স্থান পরিত্যাগ করিয়া নির্গত হইতে সাহস করে নাই।

নূতন চীনাবাজারের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে সে সময় ইংরাজদিগের নৃত্যালয় ছিল—শত্রুদল তাহা অধিকার পূর্বক অবিশ্রাম দুর্গের উপর গোলা বর্ষণ করে। ঐ দিন ইংরাজ পক্ষে বিস্তর হতাহত হইল। রজনীতে মুসলমানেরা দুর্গের চতুৰ্দ্দিকস্থ প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বাটীতে অগ্নি লাগাইয়া দিল। সাহেবেরা সভা করিয়া বসিয়া নিস্তারের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন। যাহারা সংগ্রাম কার্য্যে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁহারা স্ব স্ব কার্য্যে অনুপযুক্ত বিবেচনা করিয়া কহিলেন যে পলায়ন ব্যতীত আর উপায়ান্তর নাই। দুর্গমধ্যে যে পরিমাণ এদেশীয় লোক প্রাণ ভয়ে আশ্রয় লইয়াছিল, সে পরিমাণে খাদ্যদ্রব্য ছিল না। অতএব ঐ সভায় ইহাই অবধারিত হইল সে ভাগীরথীতে যে কয়েকখানা জাহাজ আছে তাহাতে আরোহণ করিয়া পরদিন প্রভাতে প্রস্থান করিতে হইবে৷ কিন্তু এই সকল কার্য্য সুশৃঙ্খলায় পরিচালন করিবার উপযুক্ত ক্ষমতাপন্ন এক ব্যক্তিও ছিলেন না। সকলেই কর্তৃত্ব করিতে লাগিলেন। অতএব কোন কার্য্যে বহু নায়ক উপস্থিত হইলে যেমন অমঙ্গল ঘটে, ইংরাজদিগের তাহাই ঘটিয়া উঠিল। জাহাজে প্রথমতঃ বিবিগণ উঠিবামাত্র সাহেবদিগের অন্তঃকরণে মহাআতঙ্ক উপস্থিত হওয়ায় সকলেই নদীতীরে যাইয়া নৌকারোহণে সত্বর পরপারে গিয়া জাহাজে উঠিতে লাগিলেন। গভর্ণর সাহেব এবং সেনাপতি সাহেব সকলের আগেই পলায়ন করিয়াছিলেন৷ ড্রেক সাহেবের পলায়ন সংবাদ শুনিয়া দুর্গস্থ ইংরাজেরা হলওয়েল সাহেবকে কর্তৃত্ব পদে বরণ করিলেন। যে কয়েকখানা জাহাজে পলায়িত ব্যক্তিরা আশ্রয় করিয়া ছিলেন সেগুলি এক ক্রোশ দূরে যাইয়া সেদিন থাকে। পরদিন মুসলমানেরা দুর্গ প্রবেশের উদ্যোগ করিয়াও কৃতকার্য্য হইতে পারে নাই। সাহেবেরা দুর্গ হইতে নিশান দ্বারা জাহাজস্থ লোকদিগকে বারম্বারে এই ইঙ্গিত করিতে থাকেন যে তাঁহারা আসিয়া দুর্গস্থ লোকদের পরিত্রাণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ পলায়িত সাহেবেরা উক্ত দিবসের মধ্যে একবারও ঐ ইঙ্গিত অনুসারে প্রত্যাগমন করিলেন না। তখন শেষ ভরসা চিৎপুরের নিম্নে সেন্ট জর্জ নামক যে জাহাজ লাগান থাকিত, হলওয়েল সাহেব তাহাকে দুর্গের নীচে আনিবার জন্য দুইজন সাহেবকে সংগোপনে পাঠাইয়াছিলেন। বিপদের সময় সকল উদ্যোগই ব্যর্থ হয়৷ ঐ জাহাজ আসিতে আসিতে এমন চড়ায় সংলগ্ন হইয়া গেল যে তাহা মুক্ত করিবার বিধিমতে চেষ্টা হইলেও কোন ফল হইল না। সুতরাং দুর্গস্থ অভাগাদিগের শেষ আশা একেবারে নিরাশা নীরে নিমজ্জিত হইল।

২০শে জুন প্রভাতে শত্রুদল প্রবল পরাক্রমে পুনরায় দুর্গ আক্রমণ করিলে হলওয়েল সাহেব নিরুপায় দেখিয়া নবাবের সেনাপতি মানিকচাঁদের নিকট সন্ধির প্রার্থনা পূর্বক এক পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন৷ ঐ পত্র কলিকাতার প্রসিদ্ধ ধনী বণিক উমাইচাঁদের দ্বারা লেখাইয়া ছিলেন। তাছাড়া রায়দুর্লভকে সম্বোধন পূর্বক দ্বিতীয় পত্র লেখাইয়া সাহেব স্বয়ং হস্তে লইয়া সন্ধি বিজ্ঞাপন পতাকা উড্ডয়ন পূর্বক ঐ পত্র প্রাচীরের উপর হইতে নিম্নে নিক্ষেপ করিলেন। পত্র পতিত মাত্র জনৈক পদাতিক তাহা হস্তে করিয়া লইয়া গেলে সেখানে জনতা হইল। হলওয়েল সাহেব উপর হইতে সন্ধির প্রার্থনা করিলে নবাবের জনৈক কর্মচারী কহিল:-“পতাকা নামাইয়া দুর্গের দ্বার উন্মুক্ত করিয়া যদি আত্মসমর্পণ কর, তাহা হইলে রক্ষা পাইতে পার।”

হলওয়েল সাহেব ইহার উত্তরে কথা কহিতে না কহিতে শুনিলেন যে, শত্রুদল পূর্বদিকের দ্বার ছেদ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। অতএব সন্ধির পতাকা নামাইয়া দুর্গস্থ সকলের প্রতি এই আজ্ঞা দিলেন যে, যা কিছু তোপ বন্দুক প্রভৃতি আছে, তাহাতে গোলাগুলি ভরিয়া প্রস্তুত হও। এমন সময় সংবাদ পাইলেন যে, প্রহরীরা বিশ্বাসঘাতকতা পূর্বক পশ্চিম দিকের দ্বার খুলিয়া দিয়াছে। তখন চারিদিকে শত্রুসেনা দৃষ্ট হইলে হলওয়েল সাহেব নবাবের জমাদারের হস্তে স্বীয় পিস্তল ও তলবার প্রদান পূর্ব্বক প্রাচীর হইতে সেলাম করিলেন।

সিরাজউদ্দৌলা উত্তর দিকে বেষ্টন পূর্বক পশ্চিম দিকের ক্ষুদ্র এক দ্বার দিয়া দুর্গে প্রবেশ করিল। কিছু পরে বন্ধনদশা প্রাপ্ত হলওয়েল তাহার চতুদ্দোল সমীপে আনীত হইলে নবাব তাহার বন্ধন মোচন করাইয়া আশ্বাস প্রদান পূর্বক কহিল—“তোমার মস্তকের কেশ স্পর্শ করিতেও কাহারো ক্ষমতা হইবে না।”

এরূপ এক সামান্য দল মনুষ্য কর্তৃক তাহাদের অপেক্ষায় চারিশত গুণ অধিক সৈন্য দলের অনিষ্ট চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় নবাব আশ্চর্য্য বোধ করিল। পরে দরবার হইলে কৃষ্ণদাসকে ডাকাইয়া পাঠাইলে সকলে বিবেচনা করিল নবাব তাহার উপর স্বীয় প্রচণ্ড কোপানল প্রদর্শন করিবে, কিন্তু তাহার পরিবর্তে সিরাজউদ্দৌলা কৃষ্ণদাসকে খেলওৎ প্রদান পূর্বক বিদায় করিল।

নিশাগমে সিরাজউদ্দৌলা স্বীয় শিবিরে প্রস্থান কালে জনৈক কর্মচারীর হস্তে দুর্গ রক্ষার ভারার্পণ করিল। সেই কর্মচারী ইংরাজ বন্দীদিগেকে বদ্ধ করিবার জন্য ব্ল্যাকহোল নামক কারাগারে লইয়া গেল। ঐ কারাগৃহ দৈর্ঘ্যে ১৮ ফিট ও প্রস্থে ১৪ ফিট মাত্র পরিমিত ছিল। তাহার দুই অন্তঃসীমায় এক একটি বাতায়ন দিয়া বায়ু প্রবেশ করিত। দুরন্ত সেনাদিগকে দণ্ড দিবার নিমিত্ত ইংরাজেরা ঐ স্থানটি নির্দিষ্ট রাখিয়াছিলেন। সেই ক্ষুদ্র গৃহে নবাবের কর্মচারী ইংরাজ বন্দীদিগকে বলপূর্বক নিবেশিত করিল। একে গ্রীষ্মকাল, তাহাতে অন্ধকূপবৎ সংকীর্ণ কারাকুটির মধ্যে ১৪৬ জনের সন্নিবেশ কিরূপ ভয়ানক ক্লেশের উদয় হয় তাহা চিন্তা করিলেও হৃদয় কম্পিত হইতে থাকে। বন্দীগণ অত্যল্পকালের মধ্যে ঘোরতর তৃষ্ণাকুল হইয়া হা—জল, যো জল বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। বহুতর অনুনয় বিনয়ের পরে প্রহরীরা বাহির হইতে বাতায়ন পথ দিয়া জল প্রদান করিলে, তাহা পান করিবার নিমিত্ত সকলেই উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিল। সকলেই নিঃশ্বাস লইবার জন্য উক্ত বাতায়ন সমীপে কষ্টেসৃষ্টে যাইতে লাগিল এবং অসহ্য যাতনায় প্রহরীদের কাছে অনবরত এই ভিক্ষা করিল যে, তাহারা গুলি করিয়া তাহাদের দুর্গতির শেষ করুকা এইরূপে কিছুকাল মহাকষ্টে কালক্ষেপ পূর্বক একে একে ভূতলে পতিত হইয়া শতায়ু হইতে থাকিল। অবশিষ্ট কয়েক ব্যক্তি অধিক স্থান পাওয়ায় শবস্তূপের উপর উপবেশনপূর্বক ঘন ঘন শ্বাস পরিত্যাগ করতঃ মুমূর্ষু প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় থাকিল। প্রভাতে স্বর মোচন হইলে দেখা গেল যে সেই ১৪৬ জনের মধ্যে ২৩ জন মাত্র জীবিত আছে।

এই কাল রাত্রির হৃদয় বিদীর্ণ বিবরণ পাঠকালে অতিশয় নির্দ্দদয় ব্যক্তিদেরও নয়ন হইতে করুণাশ্রু পতিত হইতে থাকে। এখনও সকল দেশে এই নির্দ্দয় কাণ্ড দুরাত্মা সিরাজউদ্দৌলার চূড়ান্ত কুকীর্তি রূপে পরিগণিত আছে। কিন্তু এ বিষয়ে তাহার সম্যক দোষ সপ্রমাণ হয় না-কারণ সে কেবল ইংরাজদিগকে বদ্ধ রাখিতে মাত্র আদেশ দিয়াছিল-কিন্তু তাহার ব্যাঘ্রবৎ নিদারুণ কর্মচারীর দ্বারাই এই কুক্রিয়া নিষ্পন্ন হয়।

সিরাজউদ্দৌলা হলওয়েল সাহেবকে কোম্পানীর কোষ প্রকাশ করিয়া দিতে আজ্ঞা করিলে ৫০,০০০ টাকা মাত্র প্রাপ্ত হওয়ায় অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইল। অতএব পূর্ব দিবস সাহেবদিগকে অভয় প্রদান করিয়াও পরদিবস মীরমদন নামক সেনাপতির হস্তে তাহাদিগকে বন্ধনদশায় সমপর্ণ করিল। অনন্তর নয়দিন কলিকাতায় থাকিয়া আলীনগর নামে কলিকাতার নূতন নামকরণ করিল এবং মাণিকচাঁদকে তাহার কর্তৃপদে অভিষিক্ত করিয়া মুর্শিদাবাদ অভিমুখে প্রত্যাবৃত হইল। গমনকালে ওলন্দাজ ও ফরাসীদের নিকট হইতে বহু লক্ষ টাকা প্রাপ্ত হওয়ায় তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া যায়। ইহার পর মীরমদন, হলওয়েল ও অপর তিনজন সাহেবকে দুর্ভেদ্য নিগড়ে বন্ধন করিয়া একখানা উলাকে আরোহণ করাইয়া প্রভুসমীপে প্রেরণ করিল। পথিমধ্যে শান্তিপুরের নিকট ঐ উলাক জলনিমগ্ন হইলে একখানা জালিয়া ডিঙ্গি আরোহণ করিয়া সাহেবেরা গমন করেন। হলওয়েল সাহেব লেখেন, প্রথমতঃ তাঁহাদিগকে কয়েক মুষ্টি তণ্ডুল ও ভাগীরথীর জল মাত্র ভোজন পাণার্থ প্রদত্ত হইত৷ শেষে সেখ বাদল নামক একজন প্রহরী দয়ার্দ্র হইয়া মুড়ি, গুড়, রম্ভা ও সঙ্গের দুই চারিটা করেলা দেওয়াতে সাহেবরা মহা আহ্লাদ পূর্বক আহার করিতেন। এইরূপে বহুকষ্টে মুর্শিদাবাদে উপস্থিত হইলে তাঁহারা একটা অশ্বশালায় রক্ষিত হন এবং তাঁহাদের প্রাণদণ্ড পর্য্যন্ত হইবার উপক্রম হয়, কেবল সিরাজউদ্দৌলার মাতামহী নবাব আলীবদ্দির মহিলার বিশেষ অনুগ্রহে তাহারা পরিত্রাণ পান।

পার্শ্বে অঙ্কিত যে সমাধির প্রতিরূপ দৃষ্ট হইতেছে, সেই সমাধি হলওয়েল সাহেব ব্ল্যাকহোল কারাগারে বিনষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণার্থ লালদিঘির পশ্চিম উত্তর কোণে সংস্থাপিত করেন। লর্ড ময়রা সাহেব ঐ সমাধিকে ইংরাজদিগের দুর্দশার অভিজ্ঞান বিবেচনা করিয়া তাহা ভগ্ন করান।

কলিকাতা পতনের সংবাদ মান্দ্রাজে পৌঁছিলে সেখানকার ইংরাজেরা অস্থির হইলেন। সেইসময় ইউরোপে ফরাসীদিগের সহিত সংগ্রাম আরম্ভ হওয়ায় দেশে ও বিদেশে সর্বত্রই বিপদ ও বিসম্বাদ উপস্থিত হইয়াছিল, অধিকন্তু পণ্ডিচেরীস্থ ফরাসীদিগের প্রতিকূলাচরণ জন্য তাঁহাদের মান্দ্রাজ থাকাই কর্তব্য ছিল। তথাপি কলিকাতায় ইংরাজদিগের বিপদবার্তাশ্রবণে তাঁহারা আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। এডমিরাল ওয়াট্সন ও কর্ণেল ক্লাইভ সাহেবের অধীনে জলপথীয় ও স্থলপথীয় উভয়প্রকার সৈন্য সংগ্রহপূর্ব্বক বাঙ্গালাদেশে পাঠাইয়া দিলেন। ক্লাইভ সাহেব ১৮ বৎসর বয়সে কোম্পানীর সিবিল সংক্রান্ত কার্য্যে নিযুক্ত হইয়া বিলাত হইতে আগমন করেন। কিন্তু আপনাকে সাংগ্রামিক কার্য্যে উপযুক্ত জ্ঞান করিয়া পরে মিলিটারী পদ গ্রহণ করেন এবং তাহাতে এমন খ্যাতি প্রতিপত্তি লাভ হয় যে, তাহার ন্যায় কীর্তিবান পুরুষ ইংরাজদিগের মধ্যে অতি অল্প দেখা যায়৷ তাঁহার পরাক্রম ও বুদ্ধিবলেই ইংরাজরা এই বৃহৎ রাজ্যের অধুনা অধীশ্বর হইয়াছেন।

ক্লাইভ ও ওয়াট্সন সাহেব ৯০০ শত ইউরোপীর ও ১৫০০ শত এদেশীয় সৈন্য সমভিব্যাহারে সেপ্টেম্বর মাসের শেষে মান্দ্রাজ হইতে যাত্রা করিলেন কিন্তু উত্তরীয় সমীরণের প্রতিঘাত বশতঃ বহু কষ্টে ২০শে ডিসেম্বর দিবসে ফলতায় আসিয়া উপস্থিত হন। উলুবেড়িয়ার দক্ষিণে ফলতা অবস্থিত—ইহার বর্ত্তমান নাম—পলতা বিরাশি।

২৮শে তারিখে মায়াপুরে পৌঁছিয়া বজবজিয়ার দুর্গ আক্রমণ করিবার জন্য ক্লাইভ সাহেব সসৈন্যে তীরস্থ হইবামাত্র কলিকাতা হইতে সহসা মানিকচাঁদ প্রচুর সেনা সমভিব্যাহারে আসিয়া পড়ায় দুই দলে যুদ্ধারম্ভ হইল। কিছুকাল পরে ইংরাজদিগের একটা গোলা মানিকচাঁদের হাউদার নিকট দিয়া চলিয়া যাওয়ায় সে কলিকাতায় পলায়ন করিলে ইংরাজরা জয়ী হইলেন। ভীরু স্বভাব মানিকচাঁদ কলিকাতাতেও আপনাকে নির্বিঘ্ন না ভাবিয়া কলিকাতা রক্ষার জন্য ৫০০ শত মাত্র লোক রাখিয়া মুর্শিদাবাদে গিয়া স্বীয় প্রভুর সহিত মিলিত হইল৷ সুতরাং এডমিরাল ওয়াট্সন সাহেব কিছু সময় গোলা বর্ষণ পরেই প্রাণহানি বিরহে ইং ১৭৫৭ অব্দের ২রা জানুয়ারী তারিখে কলিকাতা পুনরাধিকার করিলেন।

এখানে বাঙ্গালী শাসন কর্তা মানিকচাঁদের বিষয়ে এই মাত্র বক্তব্য যে, সে ব্যক্তি পদস্থ হইলে যদিও অন্যূন ৫০,০০০ সহস্র এদেশীয় লোক পুনরায় কলিকাতায় আসিয়া বসতি করিয়াছিল কিন্তু তাহার নির্দ্দয়তা ও অপহারকতার বিষয় বিখ্যাত থাকায় ধনীদিগের মধ্যে প্রায় কেহ নগরে প্রত্যাগমন করেন নাই। অদ্যাপি খিদিরপুরের একক্রোশ দক্ষিণে মানিকচাঁদের বেড় নামে একটা স্থান আছে। মানিকচাঁদ ঐ স্থানে বাস করিত।

কলিকাতা পুনরাধিকার পূর্বক ক্লাইভ সাহেব বিবেচনা করিলেন, নবাবকে ভয় প্রদর্শন না করিলে সে কদাপি সন্ধি করিবে না৷ সেজন্য দুই দিবস পরে রণতরী সমূহ প্রেরণ পূর্বক মহাধনশালী হুগলী নগর আক্রমণ করিলেন। ইতিপূর্ব্বে জগৎ শেঠের মধ্যস্থতায় ইংরাজদিগের সহিত নবাবের সন্ধি হইবার কল্পনা ছিল কিন্তু ক্লাইভ কর্তৃক হুগলী আক্রমণের সমাচার প্রাপ্ত হইবামাত্র সিরাজউদ্দৌলা মহাক্রোধাপন্ন হইয়া ইংরাজদিগকে পুনর্বার বঙ্গদেশ হইতে দূরীভূত করিয়া দিবার জন্য সসৈন্যে যাত্রাপূর্বক ৩০শে জানুয়ারী দিবসে হুগলীর নিকটে আসিয়া গঙ্গাপার হইল। ২রা ফেব্রুয়ারী দিবসে ক্লাইভ সাহেবের ছাউনীর অর্দ্ধক্রোশ দূর দিয়া গমন পূর্বক হুগলীর পশ্চাদ্ভাগে শিবির সংস্থাপন করিল। তারপর কিছুকাল উভয়পক্ষে সন্ধির প্রস্তাব হইলে ক্লাইভ সাহেব বুঝিলেন নবাব বিষকুম্ভ পয়োমুখবৎ শঠতাকরণ করিতেছে। অতএব তিনি ৪ঠা ফেব্রুয়ারী দিবসে ইউরোপীয় ও এদেশীয় সমগ্র সৈন্য লইয়া যুদ্ধারম্ভ করিলেন। তাঁহার সৈন্যসংখ্যা ২১৫০ জন মাত্র; নবাবের সৈন্য তাহা অপেক্ষা বিংশতি গুণ অধিক হইবে। কিছুকাল যুদ্ধের পর নবাবের সেনাদলে বিস্তর লোক নিহত হইলে সে ৪ ক্রোশ অন্তরে গিয়া রহিল। ক্লাইভ সাহেব পুনরায় আক্রমণের উদ্যোগ করিলে নবাব বিগ্রহজনিত ক্লেশে পরিশ্রান্ত হওয়ায় সন্ধি করিতে সম্মত হইল৷ এই সন্ধি পত্র ৯ই ফেব্রুয়ারী দিবসে স্বাক্ষরিত হয়।


পঞ্চম অধ্যায়

সন্ধিপত্রের মৰ্ম্ম-নূতন দুর্গারম্ভ-গোবিন্দপুর—টাকশাল সংস্থাপন-ক্লাইভ কর্তৃক তিন সুবার দেওয়ানি প্রাপ্তি-ছিয়াত্তরের মন্বন্তর-মহম্মদ রেজা খাঁ ও সেতাব রায়ের প্রতি বিচারসুপ্রীমকোর্ট স্থাপন—নন্দকুমারের ফাঁসী।

এই নূতন সন্ধিপত্রের মৰ্ম্ম এই যে, ইংরাজেরা পূর্ব্বে যে সকল ক্ষমতা লাভ করিয়াছিলেন, তাহা পুনরায় প্রাপ্ত হইবেন। দেশের মধ্য দিয়া তাঁহাদের বাণিজ্য দ্রব্যাদি আমদানী রফতানিকালে সেজন্য শুল্ক গৃহীত হইবে না। তাঁহারা কলিকাতায় এক দুর্গ ও টাকশাল স্থাপন করিতে পারিবেন। ইহা ব্যতীত নবাব কর্তৃক তাঁহাদের যে কিছু সামগ্রী গৃহীত অথবা বিনষ্ট হইয়াছিল নবাব সেই সকল বিষয়ের ক্ষতি পূরণ করিয়া দিবেন।

দুর্গ নির্মাণ ও টাকশাল স্থাপন বিষয়ে ইংরাজেরা ৬০ বৎসর ধরিয়া ব্যগ্র ও তৎপর ছিলেন৷ নূতন সন্ধিপত্রের মর্মানুসারে সেই চির অভিলাষ পূর্ণ হইবার বিঘ্ন চিরতরে বিগত হওয়ায় ক্লাইভ সাহেব সেই দুইটি প্রতিষ্ঠায় আর কাল বিলম্ব করিলেন না৷ অতএব পলাশী ক্ষেত্রের সুবিখ্যাত সময় বিজয় পরেই তিনি গোবিন্দপুর গ্রাম উঠাইয়া দিয়া সেইস্থানে অভিনব দুর্গ-নিৰ্ম্মাণ অবধারিত করিলেন। এই গ্রামের বার্ষিক আয় ১৭৩৮ অব্দে ৬৫০১ টাকা মাত্র ছিল কিন্তু ১৭৫২ অব্দে ২২৭৬০ টাকা আদায় হইত; তন্মধ্যে মুণ্ডি বাজার নামে গঞ্জ ছিল৷ এই গঞ্জে ধান্য, তণ্ডুল, দাল তামাক, ঘৃত, গুবাক, কাপসি, সুতা প্রভৃতি সামগ্রীর সুন্দর রূপ বাণিজ্য চলিত৷ এই মুণ্ডি বাজার ভাঙ্গিয়া খিদিরপুর, ভবানীপুর ও কালীঘাটের বাজার সকল সৌষ্ঠব লাভ করিয়াছে। এই গোবিন্দপুরেই ভূকৈলাশের ঘোষাল মহাশয়দিগের পূর্বপুরুষ কন্দর্প ঘোষালের বাস ছিল৷ ক্লাইভ সাহেব তাঁহার বাটী ও ভূমির পরিবর্তে খিদিরপুরে যে স্থানে “পুরাণো বাটী” নামক ঘোষাল পরিবারের ভগ্নাবস্থাপন্ন প্রকাণ্ড প্রাসাদ ও পটোলডাঙ্গায় এখন যে স্থলে কলেজ সমূহ ও সরোবর বিরাজমান আছে-এই উভয়স্থান প্রদান করেন। আমরা শুনিয়াছি এই “পুরাণো বাটীর” সমুদয় একতল গৃহ গোবিন্দপুরের বাটীর ইষ্টকে নির্ম্মিত। খিদিরপুর ও বৈঠকখানা প্রভৃতি স্থান নিবাসী চাষাধোবাদিগেরও গোবিন্দপুরে বাস ছিল। এই গ্রামের সন্নিকটেই নোনা জল সমূহ ছিল, সেখানে মৃগয়ার উদ্দেশ্যে সাহেবেরা বন্য মহিষাদি শিকার করিতেন।

১৮৩৬ অব্দ হইতে ৪০ অব্দ পর্যন্ত ডাক্তার স্ট্রং ও জেমস প্রিন্সেপ্ সাহেবের সদস্যতায় ফোর্ট উইলিয়ম মধ্যে এক কূপ খনিত হয়, তাহাতে ৫০০ পাদের নিম্নে সমুদ্র প্রবাহিত আছে৷ ইহাতে নির্ণীত হইয়াছে বয়র নামক একজন বিপণিপতি কর্তৃক এই নূতন দুর্গের আকার কল্পিত হয়। ক্লাইভ সাহেব এই আলেখ্য দেখিবামাত্র তাহাতে সম্মতি দিলেন কিন্তু বোধ হইতেছে, সেই কল্পনা অনুসারে দুর্গ নির্মাণ করিলে যে বিপুল অর্থব্যয় এ চিন্তা তাহার মনমধ্যে উদয় না হইয়া থাকিবে, যেহেতু ইহা নির্মাণে ক্রমে ক্রমে দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়৷ ফলতঃ এই বিপুল অর্থের যে অধিকাংশ অপচয় হইয়াছিল, তাহাতে সংশয় মাত্র নাই। ইহার এই উদাহরণ এই যে জয়নারায়ণ পাকড়াশী নামে একজন ব্রাহ্মণ দুর্গের একাংশ নির্মাণের ভার পাইয়া কয়েক লক্ষ টাকা আত্মসাৎ পূর্ব্বক শরীর গোপন করে। বর্তমানে ঐ পাকড়াশীর নামে বৌবাজারে একগলি বিখ্যাত আছে। হলওয়েল সাহেব উক্ত অর্থ অপহরণের অনুসন্ধান করিতে আজ্ঞা পাইলে কোন ব্যক্তি তাঁহাকে এক লক্ষ টাকা উৎকোচ দিয়াছিল—সাহেব তাহা কোম্পানীর খাতায় জমা দেন।

যদিও পলাশীর সংগ্রাম বিজয়ের বর্ষেই কলিকাতার পুরাতন টাকশাল স্থাপিত হয় কিন্তু ১৭৫২ অব্দের ১৯শে আগষ্ট দিবসে ইংরাজদিগের প্রথম মুদ্রা অঙ্কিত হয়। ঐ বৎসরাবধি ১৭৯১ অব্দ পৰ্যন্ত কোম্পানীর টাকা চুক্তি দ্বারা প্রস্তুত হইত। মৃত জেমস্ প্রিন্সেপ্ সাহেবের পিতা ফলতা বিরাশীতে একমাত্র টাকশাল স্থাপন পূর্বক পয়সা প্রস্তুত করিতেন। এবং উক্ত বর্ষ হইতে ১৮৩২ অব্দ পর্য্যন্ত পাতরিয়া গীর্জার পশ্চিমদিকের বর্ত অন্তরালবর্তী এক বাটীতে টাকা প্রস্তুত হইত। ঐ বাটীতে এখন “ষ্ট্যাম্প ষ্টেশনারী” আফীস স্থাপিত হইয়াছে।

অতঃপর ১৭৬৫ অব্দে ক্লাইভ সাহেব তিন সুবার দেওয়ানী পাইবার নিমিত্ত দুর্দ্দশাগ্রস্ত দিল্লীশ্বরের উদ্দেশে পশ্চিমাঞ্চলে যাত্রা করিলেন। ঐ বর্ষের ১২ই আগষ্ট তারিখে প্রয়াগ নগরে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ হইলে দিল্লীশ্বর আহ্লাদ পূর্বক কোম্পানীর পক্ষ হইতে ক্লাইভ সাহেবকে বাঙ্গালা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী পদে অভিষিক্ত করিলেন। ঐ সময়ের কোন মুসলমান গ্রন্থকার লেখেন যে, একটা গর্দ্দদভ বিক্রয় করিতে যে সময় লাগে, দিল্লীশ্বর তাহা অপেক্ষা অল্প সময়ে এই গুরুতর কার্য্য সম্পন্ন করেন। পলাশী যুদ্ধে জয়ের পর এই সফলময় কাৰ্যকে ইংরাজদিগের রাজ্যপ্রাপ্তির দ্বিতীয় কারণরূপে জ্ঞান করিতে হইবে, যেহেতু এতদ্বারা মুর্শিদাবাদ নবাবের যে কিছু শক্তি ছিল তাহা এককালে বিলোপ প্রাপ্ত হইল। ক্লাইভ সাহেব অভিলষিত লাভে মহা আনন্দিত হইয়া জয় জয় ধ্বনিতে ৭ই সেপ্টেম্বর দিবসে কলিকাতায় পুনরাগমন করিলেন।

ইং ১৭৭০ অব্দে অথবা বাঙ্গালা ১১৭৬ সালে বাঙ্গালাদেশে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়। এই দুর্ভিক্ষ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে বিখ্যাত আছে। এই দুর্ভিক্ষ দ্বারা বাঙ্গালাদেশ উৎসন্নপ্রায় হইয়াছিল৷ সেই সময়ের দুঃখী লোকের যাতনা বর্ণনা করা দুঃসাধ্য৷ লোকে কহে তিন দিবস পর্য্যন্ত এদেশ হইতে লক্ষ্মী অন্তর্হিতা হইয়াছিলেন। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর এই দেশের কিরূপ দুর্ভাগ্যজনক হইয়াছিল তাহা এক কথাতেই বিলক্ষণ হৃদয়ঙ্গম হইবে যে, এদেশের প্রজাসংখ্যার তিনভাগের একভাগ ক্ষুধানলে জ্বলিতাঙ্গ হইয়া কাল সদনে গমন করে।

ইং ১৭৭২ অব্দে হেষ্টিংশ সাহেব নবাবকে সম্পূর্ণরূপে শক্তিশূন্য করিবার মানসে বাঙ্গালাদেশের নায়েব দেওয়ান রেজাখাঁ ও বেহারের নায়েব দেওয়ান রাজা সেতাব রায়কে কলিকাতায় আনয়ন পূর্বক তাঁহাদিগের দোষানুসন্ধান করিতে থাকেন। পরে অতি অল্প কালের মধ্যে সেতাব রায়ের নির্দেদাষিতা সপ্রমাণ হইলে কলিকাতার কাউন্সিল তাঁহাকে খেলয়ৎ ও বেহারের রায় পদে অভিষিক্ত করিয়া বিদায় করিলেন। কিন্তু সেতাব রায় প্রথমতঃ পদচ্যুত হইয়া পাটনা হইতে কলিকাতায় বন্দীবৎ আনীত হওয়ায় মানহানি বশতঃ অচিরাৎ গতাসু হন। মহম্মদ রেজা খাঁর বিষয় লইয়া কৌন্সিলে বহুকাল যাবৎ বিচার হয়৷ চীৎপুরে ‘নবাবের বাগান’ নামে এখন যে জঙ্গলময় উদ্যান বাটী আছে—রেজা খাঁ এই স্থানে থাকিতেন৷ এই স্থান পূর্ব্বে অতিশয় মনোহর ছিল। ফরাসডাঙ্গা, চুঁচুড়া, শ্রীরামপুর প্রভৃতি নগর হইতে যখন ভিন্ন দেশীয় কোন রাজপুরুষ কলিকাতায় আসিতেন তখন ঐ নবাবের বাগানে উঠিয়া আতিথ্য গ্রহণ করিতেন; তারপর ইংরাজ কর্মচারীরা তাঁহাদিগকে অভ্যর্থনা পূর্ব্বক কলিকাতাস্থ গভর্ণমেন্ট হাউসে লইয়া আসিতেন।

ইং ১৭৭৪ অব্দের ১লা আগষ্ট দিবসে পার্লামেন্টের আজ্ঞানুসারে কলিকাতায় সুপ্রীম কোর্ট নামক বিচারালয় সংস্থাপিত হয়, এই বিচারালয় ইংলণ্ডীয় মহীপালের অধীন প্রতিষ্ঠিত হইয়া প্রথমতঃ কোম্পানীর গভর্ণমেন্ট ছারখার করিয়া তুলিয়াছিল। ইতিপূর্ব্বে ১৭২৭ অব্দ হইতে মেয়র কোর্ট নামক বিচারালয় ছিল। ঐ বিচারালয়ে মেয়র খ্যাত প্রাত্নিবাক ও তদধীন ৯ জন আল্ডর্ম্যান উপাধি বিশিষ্ট সহকারী বিচারপতি বিচার কার্য্য সম্পন্ন করিতেন। ইঁহাদিগের অন্যায় বিচারের দুই এক দৃষ্টান্ত পশ্চাৎ উদ্ধৃত করা যাইবে—তাহা পাঠে রহস্য রসোদয় হয়। ঐ মেয়র কোট নামক বিচারালয় এখন যেস্থলে সেন্ট আন্দ্রস গীর্জা রহিয়াছে, সেই স্থলে স্থাপিত ছিল৷ সুপ্রীম কোর্টের কার্য্যও প্রথমতঃ ঐ বাটীতে আরম্ভ হয়, ১৭৯২ অব্দে সুপ্রীম কোর্টের নূতন বাটী প্রস্তুত হইলে লালদিঘির ঈশান কোণবর্তী বিচার বাটী ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়৷ আজিও ঐ স্থানের নিকটবর্তী বর্ম “ওল্ড কোর্ট হৌসস্ট্রিট” নামে খ্যাত আছে।

ঐ বর্ষের ৫ই আগষ্ট দিবসে কুলিবাজারের নৈঋত কোণে রাজা নন্দকুমারের ফাঁসী দ্বারা প্রাণদণ্ড হয়। এই ব্যক্তি বিবিধ ষড়যন্ত্র লিপ্ত ও নানা অপরাধে অপরাধী হইলেও, তাঁহার প্রতি এই দণ্ড অতি অন্যায় হইয়াছে, অবশ্যই বলিতে হইবে৷ যেহেতু যে অপরাধে তিনি অপরাধী হন, সে অপরাধের নিমিত্ত প্রাণদণ্ড হওয়া হিন্দুদের শাস্ত্র বিরুদ্ধ এবং ক্ষণেও ইউরোপীয় বিচার দ্বারে এ অপরাধের নিমিত্ত ফাঁসীর আদেশ হয় না। বিশেষতঃ সুপ্রীম কোর্ট সংস্থাপনের ৪ বৎসর পূর্ব্বে নন্দকুমার ঐ অপরাধ সঞ্চয় করিয়াছিলেন। সুতরাং তজ্জন্য সুপ্রীম কোর্ট দ্বারা বিচার হওয়া অতীব ন্যায় বিরুদ্ধা নন্দকুমারের দোষের বিবরণ এই যে, তিনি কোন কাগজে কৃত্রিম স্বাক্ষর করাইয়া ছিলেন—তাঁহার বিরুদ্ধে কমলউদ্দিন নামক জনৈক মুসলমান উক্ত অভিযোগ উপস্থিত করাতে, সেই দোষ সপ্রমাণ হইলে পর স্যর ইলাইজা ইম্পি সাহেব নন্দকুমারের প্রাণদণ্ডের অনুমতি দেন। কিন্তু এই অবিচারের মূলীভূত কারণ অপ্রকাশিত নহে৷ তাহা এই যে, রাজা নন্দকুমার হেষ্টিংশ সাহেবের বিরুদ্ধে কৌন্সিলে এই অভিযোগ উপস্থিত করেন যে, ঐ সাহেব মুর্শিদাবাদে অপ্রাপ্ত বয়স্ক নবাব নজমউদ্দৌল্লার রক্ষণাবেক্ষণ করণীয় ভারে তাঁহার মাতা মনিবেগম ও নন্দকুমারের পুত্র গুরুদাসকে অভিষিক্ত করিয়া তিন লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করিয়াছেন। হেষ্টিংশ সাহেব ইহারই প্রতিশোধ নিমিত্ত কমলউদ্দিনকে সুপ্রীম কোর্টে খাড়া করিয়া স্বীয় শত্রুর প্রাণ লইয়া ক্ষান্ত হইলেন। যে বিচারপতি এই অন্যায় আজ্ঞা বিধান করেন তিনি হেষ্টিংশ সাহেবের সমাধ্যায়ী ও বাল্যবন্ধু ছিলেন। রাজা নন্দকুমারের ফাঁসী শুনিয়া দেশীয় লোক মাত্রে একেবারে পরিতাপালনেদ ীভূত হইয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তিন দিবস পর্য্যন্ত অনেকে জলগ্রহণ করেন নাই এবং ফাঁসীর পরেই হিন্দু মাত্রে গঙ্গায় যাইয়া স্নান করেন!


ষষ্ঠ অধ্যায়

হালহেড কৃত-বাঙ্গালা ভাষার ব্যাকরণ সুপ্রীম কোটের সহিত গভর্ণমেন্টর বিবাদ—পার্লামেন্ট কর্তৃক সুপ্রীম কোর্টের শক্তির খর্ব্বতা—কলিকাতার প্রথম সংবাদপত্র-স্যর উইলিয়ম জোন্স কর্তৃক আসিয়াটিক সোসাইটি সংস্থাপন-দশশালা বন্দোবস্তগভর্ণমেন্ট হাউস নির্মাণ-ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ সংস্থাপনসংস্কৃত কলেজ।

মুসলমানদিগের সহিত ইংরাজদিগের শাসন প্রণালী সম্বন্ধে যে কত তারতম্য তাহা বর্ণনাতীত বলিলেই হয়। মুসলমানদিগের রাজ্যকালে এই দেশ দারিদ্র্য, দাসত্ব এবং দৌরাত্ম্য প্রভৃতি দুর্দ্দদশায় পতিত ছিল। ইংরাজদিগের অধিকারে তাহার বিপরীতে বিদ্যা, বাণিজ্য, সদ্বিচার ও শান্তিরসের অধীন হইয়াছে। আমরা এই বিষয়ের এক প্রত্যক্ষ প্রমাণ এস্থলে উল্লেখ করিতেছি। মুসলমানেরা সার্দ্দদ পঞ্চশতাধিক বর্ষ পর্য্যন্ত আধিপত্য করিয়া কস্মিনকালে এদেশীয় ভাষা প্রভৃতির সৌষ্ঠববৃদ্ধি করিবার উদ্যোগ মাত্র করে নাই, বরং তাহা বিলুপ্ত করিবার উপক্রম করিয়াছিল, কিন্তু ইংরাজেরা বাঙ্গালাদেশের দেওয়ানী পাইবার দ্বাদশ বর্ষ পরেই বাঙ্গালাভাষার শ্রীবৃদ্ধি করিবার বিশেষ মতে চেষ্টা পাইতে লাগিলেন। ইং ১৭৭৮ অব্দে একজন ইংরাজ কর্তৃক বাঙ্গালা ভাষায় প্রথম ব্যাকরণ প্রস্তুত হইয়া মুদ্রাঙ্কিত হয়—ইতিপূর্ব্বে বাঙ্গালাভাষার আর কোন গ্রন্থ মুদ্রিত হয় নাই।

ইং ১৭৭০ অব্দে হালহেড নামক একজন সদ্গুণসম্পন্ন ইংরাজ সিবিল পদ ধারণ করিয়া এদেশে আগমন করতঃ গুরুতর পরিশ্রম সহকারে এখানকার বিবিধ ভাষা অভ্যাস করিতে লাগিলেন। তাহাতে অতি অল্পকালের মধ্যে এদেশীয় ভাষা সমূহে এরূপ পারদর্শী হইয়া উঠিলেন যে, সে সময় তাঁহার সদৃশ কোন ইংরাজ সে বিষয়ে নৈপুণ্য লাভ করিতে পারেন নাই। ইং ১৭৭২ অব্দে ইউরোপীয় কর্মচারীদিগের প্রতি রাজকার্য্য পরিচালনের ভার অর্পিত হইলে হেষ্টিংশ সাহেব বিবেচনা করিলেন এদেশীয় দায়াদিতে তাঁহাদের বিজ্ঞতা থাকা অতীব প্রয়োজনীয়৷ হেলহেড সাহেব সে কারণ হিন্দু ও মুসলমানদিগের দায়শাস্ত্র সংকলন করেন-সেই গ্রন্থ ১৭৭৫ অব্দে মুদ্রাঙ্কিত হয়। হেলহেড সাহেব এইরূপ আগ্রহাতিশয় সহ বাঙ্গলাভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন যে, যে সকল ইংরাজ বঙ্গভাষাজ্ঞানে বিখ্যাত হইয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে উক্ত মহাশয়কেই অগ্রে গণনা করা যাইতে পারে। পূর্বে বাঙ্গালা ভাষায় ব্যাকরণ ছিল না। তিনি ১৭৭৮ অব্দে তাহা প্রকাশ করিলেন। কলিকাতায় সেই সময় যন্ত্রালয় সংস্থাপিত হয় নাই। চার্লস্ উলকিন্স নামক কোন সাহেবের হুগলীতে এক মুদ্রাযন্ত্র ছিল৷ এই মহাশয় ইতিপূর্ব্বে বাঙ্গালা ভাষা অভ্যাসে মনোনিবেশ পূর্বক তাহাতে নৈপুণ্য লাভ করেন। অধিকন্তু তিনি একজন সুচতুর শিল্পী ও কীর্তিকুশল ব্যক্তি ছিলেন। তিনি স্বহস্তে বাঙ্গালা ভাষার বর্ণমালা সর্ব্বাগ্রে ক্ষোদিত করেন এবং সেই অক্ষর যোগে তদীয় বন্ধু হালহেড সাহেবের বাঙ্গালা ব্যাকরণ মুদ্রিত হয়।

এই সময়ে গভর্ণমেন্ট কৌন্সিলের সহিত নব বিরচিত সুপ্রীম কোর্ট বিচারালয়ের ঘোরতর বিবাদ উপস্থিত হয়। সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিগণ আপনাদিগকে ইংলণ্ডের প্রতিনিধি জ্ঞানে এদেশের সমস্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতে লাগিলেন। কি রাজস্ব, কি দায়, কি বিগ্রহ কোন প্রকার রাজকীয় ব্যাপারই তাহাদের অনধীন ছিল না। অন্যের কথা দূরে থাকুক মুর্শিদাবাদের নবাব ইংলণ্ডাধীপের প্রভুত্ব স্বীকার না করিলেও এক বিষয়ে তাঁহার উপরও সুপ্রীম কোর্টের পরওয়ানা জারী হয়৷ ইং ১৭৭৯ অব্দের আগষ্ট মাসে কাশীজোড়ার রাজার কলিকাতাস্থ গোমস্তা কাশীনাথ বাবু তাঁহার বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে মোকদ্দমা উপস্থিত করিলে তাঁহার উপর তিন লক্ষ টাকার প্রতিভূ পাইবার নিমিত্ত এক পরোয়ানা বাহির হয়। রাজা তাহা শুনিয়া পলায়ন পূর্বক আত্মগোপন করিলে ঐ পরোয়ানা জারী না হইয়া ফিরিয়া আসিলে তাঁহার মালখানা ক্রোক করিবার নিমিত্ত দ্বিতীয় পরোয়ানা বাহির হয় ও তাহা জারী করিবার নিমিত্ত শরীফ সাহেব ৬০ জন সার্জেন্ট পাঠান। তাহারা রাজবাড়ীতে উপস্থিত হইয়া ভৃত্যদিগকে প্রহার দ্বারা আহত করিয়া দ্বারভঙ্গ পূর্বক পুরী মধ্যে যায় ও অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া দ্রব্যাদি অপহরণ ও দেবালয় অপবিত্র করে এবং প্রজাদিগকে রাজস্ব প্রদানে নিষেধ করাতে আদায় স্থগিত হয়। হেষ্টিংশ সাহেব সুপ্রীম কোর্টের এই সকল অত্যাচার আর সহ্য করিতে না পারিয়া রাজাকে এই আজ্ঞা করিলেন যে তিনি কদাচ কোর্টের প্রভুত্ব স্বীকার করিবেন না এবং মেদিনীপুরের সেনাপতিকে লিখিয়া পাঠাইলেন যে, তিনি যেন শরীফের লোকদিগকে ধরিয়া রাখেন। এই আদেশ পৌঁছিতে না পৌঁছিতে তাহারা রাজবাড়ীতে উপস্থিত হইয়া যথেচ্ছাচার করিয়াছিল কিন্তু প্রত্যাগমন কালে ধৃত হয়। গভর্ণর জেনারেল সাহেব ইহা ব্যতীত জমীদার ও তালুকদারদের প্রতি এই আজ্ঞা প্রচার করিলেন যে, কেহ যেন ঐ কোর্টের পরোয়ানা মান্য না করেন ও প্রদেশীয় রাজকর্মচারীদিগকে লিখিয়া পাঠাইলেন ঐ কোর্টের কার্য্য সম্পাদন নিমিত্ত কেহ সৈন্য সাহায্য না দেন। পক্ষান্তরে সুপ্রীম কোর্টের বিচারকেরা গভর্ণর জেনারেলের এই সকল আদেশ অবগত হইয়া প্রথমতঃ কোম্পানীর উকীলকে কারাবদ্ধ করিলেন, কারণ ঐ ব্যক্তি কর্তৃক কথিত আদেশই প্রচারিত হয়। অধিকন্তু কাশীনাথ বাবুর প্রার্থনা মতে (সার্জেন্টদিগকে ধৃত করণাপরাধে) গভর্ণর জেনারেল ও কৌন্সিলের মেম্বরগণ অপরাধী বিধায় তাঁহাদিগের উপরও সুপ্রীম কোর্টের শমন জারী হইয়াছিল৷ এই ব্যাপার ১৭৮০ অব্দে সংঘটিত হয়-অবশ্য হেষ্টিংশ সাহেব ঐ শমন অগ্রাহ্য করেন। ইহার পর কলিকাতাস্থ ইংরাজেরা ও গভর্ণর কাউন্সিল বিলাতীয় কর্তৃপক্ষের নিকট সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতা হ্রাস করিবার নিমিত্ত আবেদন করিয়া পাঠাইলে পার্লামেন্ট অচিরাৎ সেই আবেদন গ্রাহ্য করিয়া এক ব্যবস্থা দ্বারা সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতার লাঘব করিলেন।

১৭৮০ অব্দে আর এক মহতী কীর্ত্তির অনুষ্ঠান হয়। ঐ বর্ষের ২৯শে জানুয়ারী দিবসে কলিকাতা নগরে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ভারতবর্ষে তৎপূর্ব্বে অপর কোন সংবাদপত্র প্রকটিত হয় নাই।

ইং ১৭৮৩ অব্দের সেপ্টেম্বর মাসে সুবিখ্যাত বিদ্বদ্বয় স্যর উইলিয়াম জোন্স সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতির ভার লইয়া কলিকাতায় আগমন করেন। তিনি স্বীয় জন্মভূমিতে বিদ্যাবিষয়ে বিশেষ যশোলাভ করিয়াছিলেন। এ দেশের প্রাচীন ইতিহাস, ধৰ্ম্ম, রীতি, নীতি প্রভৃতি অনুসন্ধান করাই তাহার ভারতবর্ষে আগমনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। কলিকাতায় উপস্থিত হইবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু প্রথমতঃ সেই ভাষায় বিজ্ঞ পণ্ডিত পাইতে মহাব্যাঘাত ঘটিল। পরিশেষে বহু অনুসন্ধানের পর সংস্কৃত ব্যুৎপন্ন জনৈক বৈদ্যজাতীয় পণ্ডিতকে মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে নিযুক্ত করিয়া তিনি স্বীয় অভিলাষ পূর্ণ করিয়াছিলেন, এখনকার ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ২০/৩০ টাকা পাইলেই কৃতার্থমন্য মানিয়া ম্লেচ্ছদিগকে দেবভাষার উপদেশ দেন কিন্তু সে সময়ে একজন অম্বষ্ঠ ৫০০ টাকার ন্যূনে তাঁহার শিক্ষকতা স্বীকার করেন নাই—ইহাতে কালের পরিবর্তনকারী নিয়মের বিলক্ষণ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। স্যর উইলিয়ম জোন্স তিন চারি বৎসরের মধ্যে সংস্কৃত ভাষায় এরূপ পারদর্শিতা লাভ করিলেন যে, তিনি অনায়াসে মনুসংহিতা অনুবাদে সক্ষম হইলেন। পর বৎসর জানুয়ারী মাসে ঐ মহোদয় আসিয়াটিক সোসাইটি নাম্নী সভা সংস্থাপিত করেন৷ এই সভাস্থাপনের মূল উদ্দেশ্য ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত, ভাষা, বিধি প্রভৃতি নানা বিষয়ের অনুসন্ধান মাত্র। তাঁহার এই সদনুষ্ঠানে অনেক মহাশয় ব্যক্তি সেই সভার সভ্য হন। ঐ মহোদয়দিগের প্রযত্নবশতঃ ইউরোপীয়েরা এদেশ সম্বন্ধীয় বিবিধ বিষয়ক জ্ঞান উপার্জনের প্রথম পন্থা প্রাপ্ত হন। হেষ্টিংশ সাহেব উক্ত সমাজের প্রতি বিশেষ উৎসাহ প্রদান পূর্বক তাহার সভাপতি হইয়া ছিলেন।

তাহার পর ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক দশশালা বন্দোবস্ত হয়। ইহার বিবরণ এই যে, পূর্ব্বে এদেশীয় জমীদারেরা রাজস্ব সংগ্রাহক মাত্র ছিলেন৷ ভূমির উপর তাঁহাদের কিছু মাত্র স্বত্ব ছিল না, লর্ড কর্ণওয়ালিশ তাহার পরিবর্তে তাঁহাদিগের সহিত নূতন বন্দোবস্ত করিয়া নির্দিষ্ট কর অবধারণ পূর্বক ভূস্বামীত্ব প্রদান করিলেন। এই বন্দোবস্ত প্রথমতঃ দশ বৎসরের জন্য প্রচলিত হয়, তজ্জন্য দশশালা বন্দোবস্ত নামে খ্যাত হইয়াছে। এই বন্দোবস্ত বিলাতীয় কর্তৃপক্ষগণের নিকট সম্মতির নিমিত্ত পাঠাইলে তাঁহারা এই প্রথা চিরকালের নিমিত্ত সংস্থাপনে আজ্ঞা দেন। তদনুসারে বাঙ্গালা ও বেহার প্রদেশের ভূমি রাজস্ব ৩১০৮৯১৫০ টাকা অবধারিত হয়। এই বন্দোবস্ত প্রস্তুত করিবার সময় কর্ণওয়ালিশ, সাহেব জন্ শোর ও কটকী কায়স্থ রাজা রাজবল্লভের দ্বারা বিস্তর উপকার পাইয়াছিলেন। শেষোক্ত মহাশয় বাগবাজারে বসতি করিতেন। আজিও তাঁহার নামে এক রাজপথ বিখ্যাত আছে। ইঁহার ন্যায় সচ্চরিত্র অথচ ক্ষমতাশীল কর্মচারী সে সময় অল্প ছিলেন।

ইং ১৭৯৯ অব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারী দিবসে মার্কুইস অব্ ওয়েলেিির শাসনকালে বর্তমান গভর্ণমেন্ট হাউসের শিলাপত্তন হয়৷ টিমথি হিকি নামক কোন সাহেব এই মঙ্গল কার্য্য সম্পাদন করেন। এই অট্টালিকার নিমিত্ত ৮০,০০০ টাকায় ভূমি ক্রয় এবং তাহার নির্মাণে ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়—ইহা ব্যতীত তাহার সজ্জাদির কারণ অর্দ্ধ লক্ষ টাকা লাগিয়াছিল। এখন যেখানে ট্রেজারি রহিয়াছে সেইখানে পূর্ব্বে সামান্য প্রকার বাটীতে ভারতবর্ষের শাসনকর্তাগণ বিরাজ করিতেন৷ কিন্তু ওয়েলেসলি বাহাদুর কহিয়াছিলেন যে, রাজপ্রাসাদে উপবেশন পূর্বক রাজবৎ সভা ধারণ করিয়া ভারতবর্ষ শাসন করা কর্তব্য, বস্ত্র ও নীল ব্যবসায়ীদিগের ক্ষুদ্র বুদ্ধি সহকারে এক পণ্যশালায় বসিয়া এ গুরুতর কার্য্য অবধারণ করা উচিত নহে।

ইং ১৮০০ অব্দে লর্ড ওয়েলেসলি বাহাদুর সিবিল সংক্রান্ত রাজপুরুষদিগের এদেশীয় ভাষায় অনভিজ্ঞতা নিবারণ নিমিত্ত ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ সংস্থাপিত করিলেন। এই বিদ্যালয়ের অধ্যাপনা কার্য্য্য নিমিত্ত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রভৃতি এদেশীয় ও ডাক্তার কেরী প্রভৃতি ইউরোপীয় মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত বর্গ নিযুক্ত হন। এক্ষণে যে দুইটি বাটীতে হরকরা যন্ত্রালয় ও একঞ্জে নীলাম স্থাপিত আছে ঐ দুই বাটীতে প্রথমতঃ উক্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই কালে দ্বিতীয় তলোপরি এক বারান্দা দ্বারা উভয় বাটীর সংযোগ ছিল।

ইং ১৮২৩ অব্দের পূর্বে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার নিমিত্ত রাজকোষ হইতে নবদ্বীপ এবং ত্ৰিহুত অর্থাৎ মিথিলাদেশের ব্রাহ্মণপণ্ডিতগণকে অর্থ প্রদান করা হইত, কিন্তু উক্ত অব্দে গভর্ণর জেনারেল বাহাদুর হুজুর কৌন্সিলে ইহাই অবধারিত করিলেন যে উক্ত অর্থদান রহিত করিয়া কলিকাতা নগরে বারাণসীস্থ সংস্কৃত কলেজের ন্যায় এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যাউক। তদনুসারে ১৮২৪ অব্দের জানুয়ারী মাসে বৌবাজারে এক কোঠা বাড়ীতে তাহার কার্যারম্ভ হয়। সে সময় ৫০ জন বৃত্তিধারী এবং ২৬ জন বৃত্তিহীন ছাত্র ৮ জন অধ্যাপকের অধীনে অষ্ট পংক্তিতে বিভক্ত হইয়া ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, ন্যায়, স্মৃতি, জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করিত। পর বৎসর পটোল ডাঙ্গায় নূতন বাড়ী প্রস্তুত হইলে তথায় তাহা সংস্থাপিত হইল, অনন্তর ১৮২৬ অব্দে আয়ুর্ব্বেদ পাঠের নিমিত্ত এক শ্রেণী ও তৎপর বৎসর ইংরাজী ভাষায় শিক্ষা নিমিত্ত শ্রেণী স্থাপিত হয়। সম্প্রতি অধ্যাপনা পক্ষে বিহিত উপায় নির্দ্ধারিত হইয়াছে। পূর্বে রাজকোষ হইতে অর্থ বরাদ্দ হইয়া এই বিদ্যালয়ের ব্যয় নির্বাহ হইত৷ অধুনা প্রিন্সিপাল শ্রীযুক্ত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্য প্রযত্নে বৃত্তিদান প্রথা রহিত হইয়া ছাত্রদিগের নিকট হইতে বেতন গৃহীত হইতেছে। পূর্ব্বে কেবল মাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সন্তানের শিক্ষা প্রাপ্ত হইত—এখন সৰ্ব্বজাতীয় হিন্দু সন্তানেরা বিদ্যাভাস করিতেছে। এই সকল কার্য্যকর নিয়ম প্রচলন করাতে পণ্ডিত বিদ্যাসাগর অবশ্যই সাধারণের ধন্যবাদ ভাজন হইয়াছেন।


সপ্তম অধ্যায়

কলিকাতার আদি বড় মানুষ-শেঠ পরিবার, বৈষ্ণবচরণ শেঠ ধোযাল পরিবার, দেওয়ান গোকুল ঘোষাল, জয়নারায়ণ ঘোষাল— বাগবাজারের মিত্র পরিবার, গোবিন্দরাম মিত্র সুবর্ণ বণিক ধর পরিবার, নকুধর, রাজা সুখময়—শোভাবাজারের রাজপরিবার, নবকৃষ্ণ, গোপীমোহন দেব-হাটখোলার দত্ত পরিবার-মল্লিক পরিবার, নিমাই মল্লিক-ঠাকুর পরিবার, দর্পনারায়ণ ঠাকুর, গোপীমোহন ঠাকুর—বনমালী সরদার—রাজা কাশীনাথ।

কলিকাতায় অধুনা যে সকল এদেশীয় মান্য পরিবার বিরাজ করিতেছেন, ইহাদের প্রায় সকলেরই শ্রীবৃদ্ধি ইংরাজদিগের আগমনের সঙ্গে আরম্ভ হয়। শেঠ ও বসাকেরা কলিকাতার আদিম বড় মানুষ। ইঁহারা ইংরাজদিগের অধীনে কৰ্ম্ম না করিলেও ইংলণ্ডীয় বণিকদিগের সহিত বাণিজ্য করিয়া বিপুল বিভব উপার্জন করিয়াছিলেন। ইংরাজদিগের সৌভাগ্যসূর্যোদয় কালে বৈষ্ণবচরণ শেঠ তন্ত্রবায়দিগের মধ্যে সর্ব বিষয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন। তাঁর তুল্য ধনী এবং সাধু লোক সে সময় অল্প পাওয়া যাইত। ইঁহার সচ্চরিত্রতার বিষয়ে বহু দৃষ্টান্ত আছে। তন্মধ্যে একটি এই যে, তৈলঙ্গাধিপতি রামরাজা তাঁহার মুদ্রাঙ্ক ব্যতীত এদেশ হইতে প্রেরিত গঙ্গাজল গ্রাহ্য করিতেন না। এখনও বৈষ্ণবচরণ শেঠের বংশে সেই মুদ্রা রহিয়াছে। তৈলঙ্গভূপালেরা এখনও সেই মুদ্রাঙ্ক ব্যতীত প্রকৃত গঙ্গাজল প্রাপ্ত হইলেও তাহাকে কুক্কুরের মূত্র বলিয়া অগ্রাহ্য করিয়া থাকেন। অপর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, এক সময় তিনি অংশীদার গৌরীসেনের নামে রঙ্গ ক্রয় করেন, ঐ রঙ্গের মধ্য হইতে রজত প্রকাশ পাওয়ায় সাধুশীল বৈষ্ণবচরণ তাহা গৌরীসেনের ভাগ্যজনিত বলিয়া সেই লভ্যের অংশ গ্রহণ না করিয়া সে সমুদয় অংশীকে প্রদান করিলেন। গৌরীসেন এই আকাশভেদী বিপুল ধনের অধিপতি হইয়া ঋণদায়ের নিমিত্ত অথবা সৎপথে আনুকূল্য করিয়া যে সকল ব্যক্তি শান্তিভঙ্গ অপরাধে দণ্ডার্হ হইত তাহাদিগের ঋণ পরিশাধ এবং দণ্ডদান দ্বারা তাহাদিগকে কারামুক্ত করিতেন৷ এজন্য এখনও লোকে কথায় বলে—লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন।

বৈষ্ণবচরণ শেঠের অন্য এক সাধুতার দৃষ্টান্ত এই যে একদা তিনি বর্দ্ধমান নিবাসী গোবৰ্দ্ধন রক্ষিত নামে একজন তাম্বুলীর কাছে দশ সহস্র মণ চিনি ক্রয় করিবার বায়না করেন। যখন ঐ শর্করা বড় বাজারের কদমতলা ঘাটে আসিয়া পৌঁছিল, তখন বৈষ্ণবচরণের লোকেরা বিক্রেতার নিকট হইতে উৎকোচ আকর্ষণ নিমিত্ত প্রভুসমীপে কহিল যে, নমুনার অপেক্ষা প্রেরিত চিনি অতিশয় অপকৃষ্ট। অতএব শেঠ মহাশয় দ্রব্যের তারতম্য অনুসারে মূল্য হ্রাস করিবার নিমিত্ত রক্ষিতকে কহিয়া পাঠাইলে সে ব্যক্তি অসাধুতা কলঙ্ক স্বীকারে অনিচ্ছুক হইয়া সে প্রস্তাবে অসম্মতি প্রদানপূর্বক সমুদয় চিনি গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করিতে স্বীয় অধীন লোকদিগকে আজ্ঞা দিল৷ সেই আজ্ঞামত কয়েক সহস্র মণ চিনি নিক্ষিপ্ত হইলে পর বৈষ্ণবচরণ সেই কথা শুনিবামাত্র রক্ষিতের সাধুতা সম্বন্ধে প্রশংসা করিতে করিতে সমুদয় মূল্য প্রদান পূর্বক অবশিষ্ট কয়েক সহস্র মণ গ্রহণে উদ্যত হন। কিন্তু গোবর্দ্ধন সমুদয় মূল্য লইলে পাছে সত্যে পতিত ও বৈষ্ণবচরণের অপেক্ষা সাধুতায় হীনকল্প হন, সেজন্য অবশিষ্ট চিনির মাত্র মূল্য গ্রহণ করিলেন। হায়! এরূপ সদাশয় ব্যক্তি এখন এদেশীয় লোকের মধ্যে কয়জন দেখা যায়।

ইহাও কথিত আছে যে, সিরাজউদৌল্লা কর্তৃক কলিকাতার দুর্গ আক্রমণকালে ইংরাজরা বিপুল অর্থ বৈষ্ণবচরণ শেঠের নিকট সংগোপন করিয়া রাখিয়াছিলেন৷ এই বিষয় যদিও ইংলণ্ডীয় কোন গ্রন্থে লিখিত নাই কিন্তু এদেশীয় প্রাচীন মণ্ডলে ইহা সুবিদিত আছে; সুতরাং “নহ্যমূলা জনশ্রুতি” এই ন্যায়ের উপর আমরা এস্থলে নির্ভর করিলাম।

অধিকন্তু এই শেঠ পরিবারের দ্বারা কলিকাতার অনেক লোক প্রধান পদবীস্থ হনা ইঁহাদিগের আশ্রয়ে ভূবৈলাশীয় ঘোষাল মহাশয়দিগের আদি পুরুষ মহাসৌভাগ্যবান হইয়াছিলেন। আমরা ঐ পরিবারের বিষয়ে কিঞ্চিৎ বাহুল্য বর্ণনা করিলাম।

ভাগীরথীর পশ্চিম পারস্থ শিবপুরের নিকটবর্তী বাকসাড়া গ্রামে রামদুলাল ঘোষাল ও কন্দর্প ঘোষাল নামে দুই ব্রাহ্মণ সহোদর বাস করিতেন। জ্যেষ্ঠ পৌরহিত্য এবং কনিষ্ঠ সাংসারিক কার্য্য্য নির্বাহে কালহরণ করিতেন। অগ্রজ এদেশীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের ন্যায় অত্যন্ত সঞ্চয়ী ছিলেন৷ অনুজ উদার চরিত্র হওয়ায় সহোদর দ্বয়ে মানসিক ঐক্যের অভাব হয়৷ কোন সামান্য সূত্রে রামদুলাল ঘোষাল সুশীল সহোদরের প্রতি কটু কষায়ণ প্রয়োগ করিতেন। কোন জ্ঞানী কর্তৃক উল্লেখিত আছে যে, পরমেশ্বরবিষ হইতে পীযূষ এবং পীযূষ হইতে বিষের উৎপত্তি করিয়া থাকেন। কন্দর্প ঘোষালের সম্পর্কে এই কথা সম্যক রূপে সপ্রমাণ হইয়াছিল। অগ্রজের কটূক্তি কালকূটে জর্জ্জরীভূত হইয়া তিতিক্ষায় আপনাকে ধিক্কার দিতে দিতে কন্দর্প উদাস্য পূর্বক বাটী হইতে কলিকাতায় আসিয়া কোন শেঠ পরিবারের আশ্রয় গ্রহণ করেন। আমরা যে সময়ের কথা লিখিতেছি সে সময় শূদ্রজাতির নিকট ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত পূজনীয় ছিলেন। সে সময়ে কোন ব্রাহ্মণ শূদ্রের বাটীতে পদধূলি প্রদান করিলে গৃহস্থ আপনাকে কৃতার্থমনা মানিতেন! অতএব কন্দর্প ঘোষাল উক্ত শেঠের দ্বারা অত্যন্ত সমাদৃত হইয়া বাস করিতে লাগিলেন; ক্রমে উভয়ের মধ্যে সদ্ভাব সঞ্চারিত হইলে তিনি শেঠদিগের সমুদয় কার্য্যের ভার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। উক্ত ধৰ্ম্মশীল ব্যবসায়ীদিগের এই এক সুনিয়ম ছিল যে, তাঁহাদিগের অধীনে যত লোক থাকিত, তাহাদিগের বেতন হইতে কিছু কিছু বাণিজ্য দ্রব্য ক্রয় করিয়া প্রতি বৎসর জাহাজ যোগে বিলাতে পাঠাইতেন—তাহাতে যে লভ্য উৎপন্ন হইত তাহা যথা অংশানুসারে সকলকে বিভক্ত করিয়া দিতেন৷ কন্দর্প ঘোষাল এই লভ্য বৎসর বৎসর গ্রহণ না করিয়া সেই উদ্দেশ্যেই সমুদয় উৎসৃষ্ট রাখাতে কয়েক বৎসর ধনশালী হইয়া উঠিলেন এবং গোবিন্দপুর গ্রামে বৃহৎ বাটী নিৰ্ম্মাণ পূর্বক বসতি করিলেন। স্বীয় মনিবদিগের পক্ষ হইতে ইংরাজ বণিকদিগের সহিত সর্বদা কথোপকথনাদি করাতে পরিশেষে তিনি ইংরাজী ভাষা কথনে এরূপ সুনিপুণ হইয়াছিলেন যে সে বিষয়ে সে সময় তাঁর তুল্য কেহই ছিলেন না। একদা মুর্শিদাবাদে ইংরাজদিগের দূত প্রেরণ প্রয়োজন হইলে তাহার সঙ্গে কন্দর্প ঘোষাল দ্বিভাষী পদে নিযুক্ত হইয়া গমন করেন। সেখানে আলীবদ্দি খাঁ তাঁহার বুদ্ধির প্রাখর্য্য দর্শনে সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে এক প্রধান পদে অভিষিক্ত করিয়াছিলেন। এইরূপে মহাশয় এক দীন ব্রাহ্মণ তনয় হইয়াও স্বীয় সাধুতা, সুতীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং অবিরাম পরিশ্রম ফলে সেই সময়ে দেশের মধ্যে একজন গণ্যমান্য মনুষ্য হইয়া উঠিলেন।

ইং ১৭৬১ অব্দে লর্ড ক্লাইভ পদত্যাগ করিলে ব্যান্সিটার্ট সাহেব গভর্ণর হন। তিনি আসিয়া দেখিলেন, মুর্শিদাবাদের নবাব মীরজাফর খাঁ জরাগ্রস্ত, অলস, ইন্দ্রিয় সুখাসক্ত এবং অযোগ্য, বিশেষতঃ দুষ্ট পারিষদবর্গে বেষ্টিত থাকায় দেশ ছারখার হইতেছে। এদিকে দিল্লীশ্বরের বিরুদ্ধে পাটনায় প্রচুর সৈন্য রক্ষা করিতে হইয়াছে এবং অন্যদিকে মাদ্রাজের অন্তঃপাতি কর্ণাট প্রদেশে ঘোরতর যুদ্ধ উপস্থিত। এই সকল দেখিয়া ব্যান্সিটার্ট সাহেব অকৰ্ম্মণ্য মীরজাফরকে পদাবসূত করিয়া তাঁহার জামাতা মীরকাসীম খাঁকে নিযুক্ত করিলেন। মীরকাসীম খাঁ কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন ছলে ইংরাজ সেনার ব্যয় নির্বাহ নিমিত্ত বর্দ্ধমান, মেদিনীপুর এবং চট্টগ্রাম এই তিন জেলার নিখিল রাজস্ব এক কালে প্রদান করিলেন এবং ইহা ব্যতীত কর্ণাটকের সাংগ্রামিক ব্যয়নির্বাহ নিমিত্ত ৫ লক্ষ টাকা দিলেন।

এই পরিচ্ছেদের প্রথমাংশে আমাদের লেখা উচিত ছিল যে কন্দর্প ঘোষালের তিন পুত্র ছিলেন। জ্যেষ্ঠ রামচন্দ্র, মধ্যম কৃষ্ণচন্দ্র এবং কনিষ্ঠ গোকুলচন্দ্র। জ্যেষ্ঠ রামচন্দ্র অপুত্রক অবস্থায় স্বল্প বয়সে পরলোকগত হন। মধ্যম কৃষ্ণচন্দ্রকে কন্দর্প স্বীয় তেজারতি কার্য্যের ভার দেন। সে সময় এই এক অযৌক্তিক ভান ছিল যে ম্লেচ্ছ ভাষা শিখিলে দৈব পৈত্র কার্য্যের সাফল্য হয় না। সেজন্য তিনি কৃষ্ণচন্দ্রকে ইংরাজী পারস্যাদি ভাষায় শিক্ষিত করান নাই। কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষাল যাগ যজ্ঞ ও বাণিজ্য কার্য্যে সময় সম্বরণ করিতেন৷ ইহার সহিত নবদ্বীপাধিপতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের মৈত্রী অর্থাৎ মিতা সম্বন্ধ সনির্বন্ধ ছিল। কণীয়ান গোকুলচন্দ্র ইংরাজী ভাষা শিক্ষা করেন এবং অতিশয় তীক্ষ্ণবুদ্ধিজীবী মনুষ্য ছিলেন।

গভর্ণর ভেরেলষ্ট সাহেব তাঁহার বুদ্ধি চৈক্কণ্যে সন্তুষ্ট হইয়া প্রাগুক্ত তিন জেলার মধ্যে চট্টগ্রামের রাজস্ব আদায়ের ভারার্পণ করেন।

অনন্তর নবাবের রাজকীয় শক্তি ক্রমশ হ্রাস প্রাপ্ত হইলে তিনি নামেমাত্র নবাব রহিলেন কিন্তু কোম্পানীর একজন কেরাণীর যে প্রভুত্ব তাহাও তাঁহার রহিল না। এই সময়ে ইংরাজ, বাঙ্গালী কর্মচারীদিগের দৌরাত্ম্যের কথা কি লিখিব, মহারাষ্ট্রীয়দিগের উৎপাতও তাহা অপেক্ষা শ্রেয়ঃকল্প ছিল। কলিকাতা, কাসিমবাজার, পাটনা এবং ঢাকা এই চারিস্থানে কোম্পানীর যে সকল কুটি ছিল, তাহা নামে কুটি থাকিলেও বস্তুতঃ ঐ চারিস্থানেই এদেশের সমুদয় রাজকীয় ব্যাপার সম্পন্ন হইতা। কলিকাতার কৌন্সিলের অধীন প্রত্যেক কুটিতে এক এক কৌন্সিল ছিল৷ ভেরেলষ্ট সাহেব গোকুলচন্দ্র ঘোষালের কর্মনৈপুণ্যে পরিতুষ্ট হইয়া চট্টগ্রামের রাজস্ব আদায় ও বন্দোবস্ত ভার হইতে তাঁহাকে উন্নত করিবার জন্য ঢাকা কৌন্সিলের দেওয়ানী পদ দিলেন।

ইংরাজদিগের পরাক্রম-সূর্য্যের পরাক্রম বৃদ্ধির সহিত দেওয়ান গোকুলচন্দ্র ঘোষালের সৌভাগ্য-সরোরুহের শ্রীবৃদ্ধি হইতে লাগিল। কিছুকাল পরেই ভেরেলষ্ট সাহেব তাঁহাকে তথা হইতে আনিয়া কলিকাতা কাউন্সিলের দেওয়ানী পদে অভিষিক্ত করিলেন। এই কালে দেওয়ানজির ঐশ্বর্য্য বুদ্ধির কথা কি লেখা যাইবে৷ কলিকাতা হইতে পূর্ব্বাভিমুখে যাত্রা করিয়া ব্রহ্মদেশের সীমা পর্যন্ত গমন করিলে বোধহয় ইহার মধ্যে আর কাহারও বিষয় ছিল না। গভর্ণমেন্ট দেওয়ান গোকুল ঘোষালকে এমন এক সনন্দ দিয়াছিলেন যে চট্টগ্রামে যত নূতন চর রচিত হইবে, সেই সমস্তের বন্দোবস্ত তাঁহার সহিত ভিন্ন অপর কোন ব্যক্তির সহিত হইবে না। সেই সময়ে যে সকল চর রচিত হয়, তাহাদিগের নাম, যথা—কাকচর, বকচর, হবে চর, হচ্চেচর, উম্নেদচর, ইত্যাদি। এই সকল চর এখন এক একটা জমিদারী হইয়া গিয়াছে। দেওয়ানজি এই সকল বিষয় ব্যতীত—বর্দ্ধমানাধিপতির কাছে ৯ লক্ষ টাকায় এক জমিদারী ইজারা লইয়াছিলেন৷ এই সকল বিভব উপার্জনে যে যথান্যায় পথ অবলম্বন করিয়াছিলেন, এমন নহে। সে সময়ে কি ইউরোপীয় এবং কি এদেশীয় কোম্পানীর ভূত্যগণ এ প্রকার উপার্জনকে অন্যায় উপার্জন জ্ঞান করিতেন না। দেওয়ানজির ধুমধামের কথা লেখা যাইতেছে। তাঁহার দুর্গোৎসবের বাহুল্য ঘটা দেখিবার নিমিত্ত নবদ্বীপাধিপতিও ছদ্মবেশ ধারণ করিয়া আসিতেন৷ একদা তাঁহার দীক্ষাগুরু কহেন-"বাপু, আমি কখন একলক্ষ টাকা একত্রে দর্শন করি নাই।” দেওয়ানজি তাহা শুনিয়া একলক্ষ টাকা স্তূপাকারে সাজাইয়া গুরুকে উৎসর্গ করিয়া দেন। কাউন্সিলের মেম্বর প্রভৃতি প্রধান রাজপুরুষেরা তাঁহার বাটীতে আমোদ প্রমোদে কালহরণ করিতেন। তাঁহাদিগের নিমিত্ত একটি স্বতন্ত্র বাটী সুসজ্জিত থাকিত। তাঁহারা যে বিলিয়ার্ড টেবিলে খেলা করিতেন, তাহা আজিও পুরাণো বাটীর সিংহদ্বারে পতিত আছে।

দেওয়ান গোকুল ঘোষাল বিপুল বিপুল বিভবের স্বামী হইয়াও বহুকাল পর্য্যন্ত এক ধনে বঞ্চিত ছিলেন। তাঁহার প্রথম বয়সে এক পুত্রসন্তান জন্মিয়া অতি অল্প বয়সে লোকান্তর গমন করে। জ্যেষ্ঠভ্রাতা নিঃসন্তান হইয়া পরলোকগত হন; মধ্যম কৃষ্ণচন্দ্রের একমাত্র পুত্র-সুতরাং সমুদয় বাৎসল্য ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি বৰ্ত্তিয়াছিল৷ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতুষ্পুত্রের নাম জয়নারায়ণ ঘোষাল৷ বর্দ্ধমানেশ্বরের নিকট হইতে জমিদারী ইজারা গ্রহণের তাৎপর্য্য এই যে, মণ্ডলঘাট পরগণায় রাজা দুর্গারাম নামে একজন জমিদার ছিলেন। এক সময়ে বর্দ্ধমানাধিপতির জননী পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে যাত্রা করিয়া দুর্গারামের বাটীর নিকট হইয়া গমনকালে সেই সাময়িক রীতি অনুসারে দামামা ধ্বনি করিয়াছিলেন। তাহাতে দুর্গারাম ক্রোধোন্মত্ত হইয়া স্বদলবলে তীর্থানুরাগিণী মহিষীর তাম্বু লুট করেন। রাণী সেই অপমানে আর শ্রীক্ষেত্রে গমন না করিয়া অশ্রুমুখে স্বীয় পুত্রের নিকট দুর্গারামের অত্যাচার বিজ্ঞাপন করেন। তাহাতে বর্দ্ধমানাধিপতি জ্বলিতাঙ্গ হইয়া সৈন্য প্রেরণ পূর্বক ঐ জমিদারের সমুদয় জমিদারী কাড়িয়া লন। দুর্গারাম বিষয় বিনাশে ক্ষুণ্ণমনে পলায়ন পূর্বক গভর্ণমেন্ট কৌন্সিলে দেওয়ান গোকুল ঘোষালের প্রভুত্ব জানিয়া তাঁহার আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। দেওয়ানজি তাঁহাকে আশ্বাস দিয়া তাঁহার কন্যার সহিত ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহ দিবার প্রস্তাব করাতে দুর্গারাম তৎক্ষণাৎ তাহাতে সম্মত হন। কিন্তু বৈবাহিক সম্বন্ধ নির্বন্ধ হইলে দেওয়ানজি তাঁহার উপকার করা দূরে থাকুক, বর্দ্ধমানপতিকে ভয়-মৈত্রী দেখাইয়া দুর্গারামের বিষয় শুদ্ধ আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের নামে বহুলক্ষ টাকায় ইজারা লন। ঐ ইজারা বেমেয়াদী অর্থাৎ তাহাতে কালের নির্দ্দেশ ছিল না। কিন্তু এরূপ অন্যায় উপায়ে বিষয়োপার্জন করিলে প্রায় কখন ভোগ হয় না। গোকুলচন্দ্র, পুত্রমুখ দর্শনে লোলুপ হইয়া পুনঃ পুনঃ বিবাহ করিলেন। তাহাতে এক পুত্রসন্তান জন্মিলে সেই পুত্রের প্রতি কিরূপ স্নেহ জন্মিয়াছিল এস্থলে তাহার বর্ণনা করা বাহুল্য মাত্র। ভ্রাতুষ্পুত্র জয়নারায়ণ অতিশয় উপযুক্ত, বিষয় বিভবাদির অধিকাংশ তাহার নামে রহিয়াছে। সেজন্য ঐ পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষেই তাঁহাকে কৌশল ক্রমে কহিলেন:-“বাপু, জয়নারায়ণ! বর্দ্ধমানের ইজারা তোমার ভ্রাতাকে যৌতুক স্বরূপ দাও।”

জয়নারায়ণ ঘোষাল তৎক্ষণাৎ তাহাতে সম্মত হইলে বর্দ্ধমান রাজ সমীপে জয়নারায়ণের নাম পরিবর্তে স্বীয় পুত্রের নাম প্রচলনের নিমিত্ত গোকুল ঘোষাল লিখিয়া পাঠাইলেন৷ সেই সময় বর্দ্ধমানের রাজ কর্মচারীগণ এক এক ধনুর্দ্ধর ছিলেন৷ তাঁহারা দেওয়ান ঘোষালের সহিত পূর্ব বন্দোবস্ত অতি অন্যায় হইয়াছে, ইহা বিবেচনা করিয়া পত্রোত্তরে লিখিলেন যে, পূর্ব ইজারাদার জয়নারায়ণ ঘোষাল ইস্তফা না করিলে নূতন নামে বন্দোবস্ত হইতে পারে না। তদনুসারে জয়নারায়ণের ইস্তফা প্রেরিত হইলে বর্দ্ধমানাধিপতি লিখিয়া পাঠাইলেন পূর্ব ইজারা দেয় ইস্তফা মঞ্জুর করা গেল কিন্তু ভবিষ্যতে আর ইজারা দিবার আবশ্যকতা নাই। এইবার পাঠকবর্গ দেওয়ানজির অপেক্ষা বর্দ্ধমানাধিপের চতুরালীর অবশ্যই সমধিক প্রশংসা করিবেন। দেওয়ানজির রাজা দুর্গারামকে ফাঁকি দিতে বসিয়াছিলেনআপনিও তেমনি ফাঁকিতে পড়িলেন।

সং ১১৮৬ অব্দে দেওয়ান গোকুলচন্দ্র ঘোষাল চারিপুত্র রাখিয়া পরলোকগমন করেন। জয়নারায়ণ ঘোষাল বিষয় বিজ্ঞ অথচ চতুর বুদ্ধি হওয়ায় দেওয়ানজি তাঁহাকে একজন ওসি করিয়া যান। কিন্তু এদেশে সাধারণতঃ কথায় বলে, শিশু নায়ক, বহুনায়ক এবং স্ত্রীনায়ক যে পরিবারে হয় সে পরিবারে কোন রূপেই ভদ্র নাই; ঘোষাল পরিবারেও তাহাই ঘটিয়া উঠিল৷ গোকুলচন্দ্র ঘোষালের দয়িতাগণ-একে অপক্ক বুদ্ধিশীলা তরুণ বয়স্কা, তাহাতে শিশুগণ দুষ্ট মন্ত্রীদ্বারা পরিবেষ্টিত, সুতরাং ঘোষাল পরিবারে অতি শীঘ্রই ঘোরতর বিপদ উপস্থিত হইল৷ জয়নারায়ণ ঘোষাল পরিণামদর্শী ব্যক্তি ছিলেন, ভারী বিপত্তি ভাবিয়া দেওয়ানজি বর্তমান থাকিতেই ভূকৈলাশের বাটী নির্মাণ আরম্ভ করেন। শকাব্দ...বর্ষে ভূকৈলাশ পত্তন হয়৷ এই ভূকৈলাশের প্রথম নাম কালীবাগান। শকাব্দ...বর্ষে জয়নারায়ণ ঘোষাল বৃহৎ বৃহৎ শিবলিঙ্গদ্বয় ও শকাব্দ...বর্ষে পতিত পাবনী প্রতিষ্ঠা করেন।

এদিকে জয়নারায়ণ ঘোষাল ভূকৈলাশ পুরী নির্মাণ করিতেছেন ওদিকে তাঁহার খুল্লতাত পুত্রগণ তাঁহার বিপক্ষে সুপ্রীম কোটে গুরুতর মোকদ্দমা উপস্থিত করিলেন। এই মোকর্দ্দদমা সূত্রে ঘোষালদিগের ভারি ভারি ভূসম্পত্তি সকল বিক্ৰীত হইয়া যায়৷ কেবল সুপ্রীম কোর্টের খরচারূপ অনলে ১৪ লক্ষ টাকা ভস্মীভূত হইয়াছিল, কলিকাতার কোন কোন ধনী মহাশয়েরা এ বিষয়ে বঙ্গ দর্শনার্থ গৃহ বিচ্ছেদ জননীর অভিসন্ধি যোজনার ত্রুটি করেন নাই। এই মোকদ্দমা রফা হইবার অনেক পূর্বে দেওয়ান ঘোষালের বংশধরেরা একে একে স্বল্প বয়সে পরলোকগত হন।

জয়নারায়ণ ঘোষাল অতিশয় সাহসী ও সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি ছিলেন। তিনি ইংরাজদিগের সৎগুণাবলীর প্রশংসা করিতেন এবং আপনিও তদনুসারে কার্য্য করিতেন। এজন্য তাঁহার সহিত বাঙ্গালীদিগের বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। তিনি তাঁহাদিগের ন্যায় সাহেবদের স্তাবক ছিলেন না। একদা শালিখা নিবাসী রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত বসিয়া আছেন, এমন সময় সদর বোর্ডের একজন মেম্বর তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলে রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সসম্ভ্রমে গাত্রোখান পূর্বক করজোড়েড় দণ্ডায়মান রহিলেন৷ সাহেব ঘোষাল মহাশয়ের সহিত ইষ্টালাপ করিতে করিতে প্রসঙ্গতঃ ইংরাজ জাতির ব্যবহার সম্বন্ধে তাঁহার অভিপ্রায় জানিতে ইচ্ছা করিলে তিনি ইংরাজদিগের রীতিনীতির বিস্তর প্রশংসা করিয়া স্বজাতীয়দিগের ব্যবহারের নিন্দা করিবার দৃষ্টান্তছলে রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখাইয়া কহিলেন—“দেখুন। ইনি আমাদিগের দেশের একজন ভদ্রলোক কিন্তু আপনি আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসায় উনি কি জন্য গাত্রোখান পূর্বক গোলামের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিয়াছেন?” এই কথা শুনিয়া সাহেব হাস্য করিতে লাগিলেন কিন্তু রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তাহাতে বিরক্ত হইয়া সেই পৰ্য্যন্ত আর ভূকৈলাশে আগমন করিতেন না।

একদা জয়নারায়ণ, সুবিখ্যাত বিদ্বান স্যর এডওয়ার্ড কোলব্রুক সাহেবের নিকট বসিয়া আছেন, এমন সময়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পুত্র শম্ভুচন্দ্র রায় আসিয়া অন্যান্য কথা কহিতে কহিতে অসভ্যতা পূর্বক কহিলেন—“ঘোষাল দাদা, আপনি জ্ঞানবান ব্যক্তি হইয়া একটা শ্যাবদন্ত রাখিয়াছেন—উচিত হয় শ্যাবদন্তটা পরিত্যাগ করেন।”-হিন্দুশাস্ত্র মতে পূর্ব্বজন্মে কেহ সুরাপায়ী হইলে পরজন্মে তাহার শ্যাবদন্ত হয়। জয়নারায়ণ ঘোষাল, তাহার উত্তরে কহিলেন-“রাজাভায়া, আমার শ্যাবদন্ত পরিত্যাগের পূর্ব্বে আপনার উচিত হয়, আপনার গলদেশে যে আবটা আছে, তাহা কাটাইয়া ফেলেন।”

কোলব্রুক সাহেব তাঁহাদের এই বাকচাতুরীর অর্থ বুঝিতে না পারিয়া জয়নারায়ণ ঘোষালকে তাহার মর্ম্ম জিজ্ঞাসা করাতে তিনি সমীপোবিষ্ট প্রসিদ্ধ পণ্ডিতবর রঘুমণিকে দেখাইয়া দিয়া কহিলেন উহাকে জিজ্ঞাসা করুন। ইহাতে রঘুমণি মহা বিপদে পড়িলেন। শ্যাবদন্তের দোষের কথা অনায়াসে বলিতে পারেন কিন্তু আব থাকায় পূর্বজন্মর্জিত পাপ অতি উৎকট। অতএব তিনি কোন বাঙনিষ্পত্তি না করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। তথাপি কোলব্রুক সাহেব মহাব্যগ্র হইয়া বারম্বার প্রশ্ন করিলে সুচতুর অধ্যাপক পুস্তক হইতে তাহা বাহির করিয়া রাজাকে পাঠ করিতে দিলেন৷ তাহা দেখিয়া রাজা চতুর্দ্দিক শূন্য দেখিতে লাগিলেন।

জয়নারায়ণ ঘোষালের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বিষয়ে আরো অনেক কথা আছে কিন্তু সে সমস্ত লিখিলে বাহুল্য হইয়া উঠে, তথাপি আর এক কথা লিখিয়া এ বিষয় শেষ করা যাইতেছে। জয়নারায়ণ স্বীয় পিতার পরলোক গমন পরে রাজা নবকৃষ্ণের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করিলে রাজা নবকৃষ্ণ কহিলেন-“আপনি অতি প্রধান লোকের পুত্র, দেওয়ান গোকুল ঘোষালের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার ক্রিয়া উপস্থিত, তাহাতে বিশেষ সমারোহ করিতে হইবেক, ওরে-কে আছিস রে—আমার মা ঠাকুরাণীর শ্রাদ্ধের খাতা লইয়া আয়৷”

ঘোষাল কহিলেন—“মহাশয়! আমার পিতৃশ্রাদ্ধ উপস্থিত। মহাশয়ের পিতৃশ্রাদ্ধের ব্যয়ের ফদ্দ আনিতে আজ্ঞা করুন। আমার তো মা ঠাকুরাণীর ক্রিয়া উপস্থিত নহে।”

রাজা নবকৃষ্ণ একথা শুনিয়া অবাক হইলেন। কারণ তাঁহার মাতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে ৯ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়াছিলেন বটে কিন্তু তাঁহার পিতৃশ্রাদ্ধ তিল কাঞ্চন গঙ্গাজল বস্ত্রে সম্পন্ন করিতে হইয়াছিল; যেহেতু সে সময় তাঁহার অবস্থা অতি সামান্য ছিল।

এইরূপে জয়নারায়ণ ঘোষাল দেশীয়গণের দ্বেষের পাত্র হইয়া বারাণসীতে গমন পূর্বক নানা জনহিতকর কার্য্যে কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন।

এদেশীয় লোকের নিমিত্ত তিনিই সর্বাগ্রে এক অবৈতনিক বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়া তাহাতে ইংরাজী, পারস্য, সংস্কৃত, বাঙ্গালা প্রভৃতি ভাষার শিক্ষার্থ প্রচুর দান করেনা আজিও ঐ বিদ্যালয় জয়নারায়ণ কলেজ নামে কাশীতে বিরাজমান রহিয়াছে। ইহা ব্যতীত আরও অনেক সৎকার্য্যের প্রতিষ্ঠা করেন। বারাণসীতে মহারাষ্ট্রীয়, মুসলমানীয় ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় যে সকল রাজন্যবর্গ গভর্ণমেন্টের বৃত্তিভোগী হইয়া জীবন-যাপন করিতেন, তাঁহাদিগের উপকারার্থ তিনি বিশেষ যত্ন করিতেন। যেহেতু তিনি ইংলণ্ডীয় প্রধান মণ্ডলে অত্যন্ত গণ্যমান্য ছিলেন, কোন মান্য পরিবারের কোন বিষয়ে অসম্মান বা অস্বাচ্ছন্দ্য উপস্থিত হইলে তাঁহারা ঘোষাল মহাশয়ের আশ্রয়ে গ্রহণ করিলেই কৃতকার্য্য হইতেন। এজন্য তাঁহারা সকলেই তাঁহাকে বাবা জয়নারায়ণ নামে সম্বোধন করিতেন কারণ তিনি স্বার্থত্যাগী হইয়া পরোপকার ব্রত পালন করিতেন এবং এইজন্য দিল্লীশ্বর তাঁহাকে 'মহারাজা বাহাদুর' উপাধি প্রদান করেন। সেই রাজকীয় সম্মান চিহ্ন ঘোষাল মহাশয়েরা আজিও বৃটিশ গভর্ণমেন্টের অনুগ্রহে ভোগ করিতেছেন।

জয়নারায়ণ ঘোষাল কোন ধর্মের বিপক্ষ ছিলেন না। তিনি বারাণসীতে এক সভাতে বসিয়া বেদ, বাইবেল, কোরাণ প্রভৃতি সর্বপ্রকার মতাবলম্বী মনুষ্যদিগকে লইয়া আমোদ করিতেন। তিনি এক সংবাদপত্র প্রচারের অনুষ্ঠান করেন। ঐ অনুষ্ঠান পত্র বিশুদ্ধ ইংরাজী ভাষায় লিখিত আছে। দেশ কাল পাত্র বিবেচনা করিলে সে সময়ে এমন বিষয়ে অনুষ্ঠান আশ্চর্য্যজনক সন্দেহ কি? অন্য দিকে তিনি মনে মনে এদেশীয় কৌলীন্য মর্য্যাদার প্রতিকূল ছিলেন—কারণ তাহার রচিত “কুলীন কন্যার উক্তি” শীর্ষক রহস্যজনক এক গীতেই তাহার বিলক্ষণ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। যথা-

গীত হায়! কবে লাগিবে লগন।

পতি বিনে হত গত জীবন যৌবন

পাপী কুলীনের ঘরে আমার জনম,

কুলীন নায়ক বিনে না হয় ঘটন,

স্বয়ব্বরা হইতেকহে জয়নারায়ণ॥

অধিকন্তু তাঁহার রচিত এক এক যুক্তিযুক্ত বাক্যের মূল্যও সাধারণ নহে। যথা-

“জগৎ তারণ যিনি তিনি এক লকড়ি।

যা না খেলে প্রাণ বাঁচে না তারে বলে সকড়ি।

যাতে জন্ম যার কৰ্ম্ম তা করিলে পাপ।

এমন দেশে থাকবো নাকো বাপরে বাপ্।”

এই মহাশয়...বর্ষে বারাণসীতে প্রাণত্যাগ করেন।


৭_১

সপ্তম অধ্যায়ের বর্দ্ধিতাংশ ॥ শোভাবাজারীয় রাজ পরিবার

* কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেছি নিম্নলিখিত প্রবন্ধ রাজা রাধাকান্ত বাহাদুরের আনুকূল্যে লিখিত হইল।

যদিও এই পরিবারের সৌভাগ্য প্রতিভা রাজা নবকৃষ্ণের শ্রীবৃদ্ধির উপর নির্ভর রহিয়াছে কিন্তু তাঁহার পূর্ব্বেও ঐ বংশের কীর্তিকলাধর অনেক ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ইঁহাদিগের পীতাম্বর নামক জনৈক পূর্বপুরুষ একদা ঘটক কুলীনদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া পথিমধ্যে এক তটিনীর উপর ধান্য দিয়া সেতু বন্ধন পূর্বক আহূতগণের পারাবতরণের সুপন্থা করিয়াছিলেন বলিয়া তাঁহার নাম “ধান্য পীতাম্বর” হয়। তা ছাড়া তিনি গৌড় রাজ্যাধিপতির নিকট হইতে "ক্ষ্মা” উপাধি প্রাপ্ত হন। তাঁহার বংশে দেবীদাস নামক অপর এক ব্যক্তি “মজমুয়াদার” উপাধিসহ মুড়াগাছা পরগণার কানুনগো ছিলেন। এই দেবীদাসের যট্ তনয়ের মধ্যে সহস্রাক্ষ এবং রুক্মিণীকান্ত মুর্শিদাবাদে যাইয়া নবাব মহাবৎ জঙ্গের নিকট উপস্থিত হইলে তিনি সহস্রাক্ষকে পিতৃপদে অভিষিক্ত করিয়া রুক্মিণীকান্তকে মুড়াগাছা পরগণার অপ্রাপ্ত ব্যবহার ভূম্যধিকারী কেশবরাম রায়চৌধুরীর বিষয়—নির্বাহক পদে ব্যবহৰ্ত্তা উপাধি প্রদান পূর্বক নিযুক্ত করিলেন। তৎপুত্র রামেশ্বর ব্যবহর্তা মুড়াগাছা পরগণা হইতে পূর্ব্বাপেক্ষা সমধিক আয় সম্ভাবিত করিয়া নবাব সরকারে বাহুল্যকর প্রদান করাতে কেশবরাম রায় তাঁহাকে স্বীয় পুলী মধ্যে কারারুদ্ধ করেন। রামেশ্বরের মধ্যম পুত্র রামচরণ মুর্শিদাবাদে যাইয়া রায় রাঁয়া চৈনরায়ের নিকট উপস্থিত হইয়া মুড়াগাছা পরগণার রাজস্ব ৫০,০০০ টাকা পর্য্যন্ত বৃদ্ধি করিবার প্রস্তাব করিলে রায় রাঁয়া তাঁহাকে উত্তর পরগণার রাজস্ব বর্দ্ধক পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া পাঠান, রামচরণ স্বদেশে প্রত্যাগমন পূর্বক জনককে কারামুক্ত করিবার পর প্রতিহিংসা ঋণ পরিশোধ নিমিত্ত কেশবরাম রায়কে কারাগারে বদ্ধ করিলেন।

রামচরণ ব্যবহর্তা মুড়াগাছা পরিত্যাগ করিয়া কলিকাতায় আসিয়া গোবিন্দপুর বাটী নির্মাণ পূর্ব্বক স্বীয় পরিবারদিগকে তথায় রাখিয়া পুনর্বার নবাবের দরবারে উপস্থিত হন৷ তাহাতে হিজলি, তমলুক ও মহিষাদল প্রভৃতি প্রদেশের লবণের ও অপর প্রকার রাজস্ব আদায়ের ভার প্রাপ্ত হইয়া ঐ কার্য্য এমন সুচারু রূপে নির্বাহ করেন যে মহাবৎ জঙ্গ তাঁহার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া এক উচ্চতর পদে তাঁহাকে উন্নতি করেন। তাহা এই যে, ঐ সময়ে আড়কাটের সুবেদারের সহিত তাঁহার ভ্রাতা মুনিরুদ্দিন খাঁ দ্বন্দ্ব করিয়া মুর্শিদাবাদে আসিলে নবাব তাঁহাকে কটকের সুবেদারী পদে বরণ করিয়া রামচরণকে তাঁহার দেওয়ানরূপে নিযুক্ত করিয়া প্রচুর সৈন্য সঙ্গে দিয়া উক্ত অঞ্চলে মহারাষ্ট্রীয় দিগের উৎপাত নিবারণ কল্পে পাঠাইয়া দিলেন। ইঁহারা মেদিনীপুরের নিকট অতি অল্প মাত্র শরীর রক্ষক সেনা সহ উপস্থিত হইলে এক গোপনীয় স্থান হইতে ৪০০ অশ্বারোহী পিণ্ডারী সহসা উপস্থিত হইয়া তাঁহাদিগকে আক্রমণ করে। মুনিরুদ্দিন ও রামচরণ প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া পরিশেষে স্বদল বলে নিহত হন।

রামচরণের তিন পুত্র—রামসুন্দর, মাণিক্যচন্দ্র এবং নবকৃষ্ণ। রামচরণ স্বীয় সমুদয় হুগলী নগরীর ফকীর তজ্জার নামক জনৈক ধনবান বণিকের নিকট গচ্ছিত রাখিয়াছিলেন। ফকির তজ্জারের মৃত্যু হইলে উক্ত পিতৃহীনত্রয় একেবারে সর্বস্বান্ত প্রায় হইলেন কিন্তু রামচরণের পত্নী অতিবুদ্ধিমতী ছিলেন। তিনি বিস্তর আবাসে অবশিষ্ট সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ পূর্বক স্বীয় সন্তানদিগকে উত্তমরূপে লেখাপড়া শিখাইয়াছিলেন৷ ইতিপূর্ব্বে ভাগীরথীর তীরবর্তী হুগলী নগরীর বাটী জলসাৎ হওয়ায় ইহারা মুড়াগছার অপ্তঃপাতী পঞ্চগ্রামের (পাঁচ গাঁ) বাটীতে গিয়াছিলেন৷ বাং ১১৩৭ অব্দে রাজা নবকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। যাহা হউক উক্ত বুদ্ধিশীলা স্ত্রীলোক পুনর্বার গোবিন্দপুরে আসিয়া এক নূতন বাটী নিৰ্ম্মাণ পূর্বক পুত্রগণ সহ বাস করিতে লাগিলেন। নবকৃষ্ণ শৈশবাবস্থা উত্তীর্ণ হইতে না হইতে স্বীয় অসাধারণ ধীশক্তির বিলক্ষণ লক্ষণ প্রদর্শন করতঃ অতি অল্প কাল মধ্যে একজন সুনিপুণ পারশ্য বিদ্যাবিদ রূপে বিখ্যাত হইলেন৷ তিনি মুর্শিদাবাদে যাইয়া উক্ত বিদ্যায় সমীচীনতা লাভ করেন এবং কলিকাতায় থাকিয়া চলন মত ইংরাজী ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। সে সময়ে শেষোক্ত ভাষায় পারদর্শিতা লাভ করা কিরূপ কঠিন ব্যাপার ছিল তাহা সকলে বুঝিতে পারেন। নবকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রামসুন্দর ব্যবহর্তা পঞ্চকূটের তত্ত্বাবধায়ক পদে নিযুক্ত থাকিয়া স্বীয় পরিবারদিগকে প্রতিপালন করেন।

সিরাজউদ্দৌল্লার আগমন সংবাদে ড্রেক সাহেব যে সময় অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন সেই সময়ে মুর্শিদাবাদ হইতে রাজা রাজবল্লভ দূত দ্বারা তাঁহাকে লিখিয়া পাঠান যে নবাবের পারিষদবর্গ বিশেষতঃ হিন্দু সম্ভ্রান্ত লোক মাত্রেই তাঁহার প্রতি বিরুদ্ধ ভাব প্রকাশ করিতেছেন এবং সকলের এমন ইচ্ছা যে, ইংরাজদিগের সহায়তা করেন। কিন্তু পত্রবাহক ড্রেক সাহেবকে কহিল এই পত্র কোন মুসলমান দ্বারা পঠিত না হইয়া হিন্দুদ্বারা পাঠ করাইবার আদেশ আছে। ইহা শুনিয়া ড্রেক সাহেব জনৈক পারশ্যবিদ্যাবিৎ হিন্দুর অন্বেষণে চারিদিকে লোক পাঠাইলেন। দৈবাধীন সেই দিবস নবকৃষ্ণ ব্যবহর্তা স্বকীয় কার্য্যোপলক্ষে বড়বাজারে গিয়াছিলেন৷ ড্রেক সাহেবের লোকেরা জনরবে তাঁহার পারশ্য ভাষার ব্যুৎপত্তি বাহুল্যের কথা অবগত হইয়া তাঁহাকে সঙ্গে লইয়া সাহেবের নিকট উপস্থিত করিল। নবকৃষ্ণ ঐ পত্র পাঠ পূর্বক ইংরাজীতে তাহার মর্ম্ম অবগত করিলে পর সাহেব তাঁহার দ্বারা পত্রের উত্তর লিখিয়া পাঠাইলেন৷ সেই সময় তাঁহার বয়স ১৬ বৎসরের অধিক হয় নাই। তাঁহার কার্য্যে সন্তুষ্ট ড্রেক সাহেব ২০০ শত টাকা বেতনে নবকৃষ্ণকে কোম্পানীর মুন্সিপদে নিযুক্ত করেন। ঐ পদে তৎপূর্বে তাজুদ্দিননামক একজন মুসলমান নিযুক্ত ছিলেন। সেই হইতে নবকৃষ্ণ মুন্সি নামে বিখ্যাত হন৷ ড্রেক সাহেব সেই সময়ের নীতি অনুসারে তাঁহাকে সওয়ারী খরচ প্রদান করিতেন৷ এই মুন্সিগিরি কার্য্যে তিনি এরূপ পারদর্শিতা প্রকাশ করেন যে তারপর ক্লাইভ সাহেব তাহাতে সাতিশয় পরিতুষ্ট হইয়া রাজকীয় গুরুতর কার্য্য মাত্রে তাঁহাকে নিযুক্ত করিতেন। সিরাজউদ্দৌল্লা দ্বিতীয়বার কলিকাতা আক্রমণে আসিলে তাহার সহিত সন্ধি নিবন্ধন ছলে নবকৃষ্ণকে উপটৌকন সহ তাহার শিবিরে প্রেরণ করিলে তিনি নবাবী সৈন্যের প্রকৃত অবস্থা দর্শন পূর্বক স্বীয় প্রভু সমীপে বিজ্ঞাপন করেন। অধিকন্তু মীরজাফরের সহিত ক্লাইভের গোপনীয় অভিসন্ধি সংস্থাপনে নবকৃষ্ণই উদ্যোগী ছিলেন। এই অভিসন্ধি হেতু সিরাজউদ্দৌল্লার সর্বনাশ হয়।

অনন্তর মীরকাশেমের সহিত যুদ্ধ উপস্থিত হইলে তিনি আতামস্ সাহেবের সহিত থাকিয়া বৃটিশ পক্ষে বিশেষ সাহায্য করেন। এই সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অতিশয় পীড়িত হইয়াছিলেন। ক্লাইভ সাহেব যে সময়ে প্রয়াগে শাহ আলমের সহিত সন্ধি সংস্থাপন করেন, সেই সময়ে নবকৃষ্ণ মুন্সি বিশেষ উপকারে লাগিয়াছিলেন। অযোধ্যাধিপতি সুজাউদ্দৌল্লার সহিত সন্ধির সময়ে তাঁহার কৰ্ম্মকুশলতা বিশিষ্ট রূপে সপ্রমাণ হয়৷ বারাণসীপতি বলবন্ত সিংহ ও বেহারের রায় রাঁয়া সিতাব রায়ের সহিত বন্দোবস্ত কালেও মুন্সি মহাশয় প্রকৃষ্ট পরিশ্রম করিয়াছিলেন৷ গভর্ণর ভেরেলষ্ট সাহেব রচিত বাঙ্গালা দেশের অবস্থা বর্ণনা গ্রন্থে তাঁহার বিষয়ে এরূপ লিখিত আছে, মীরজাফরের সুবাদারী পূর্ব্বে নবকৃষ্ণ ইংরাজ পক্ষে নিরতিশয় উৎসাহ সহকারে পক্ষতা করিয়াছিলেন। মীরকাশেমের সহিত যুদ্ধ উপস্থিত হইলে যে পর্য্যন্ত উক্ত সুবাদার এ প্রদেশ হইতে দূরীভূত না হইয়াছিল সে পর্য্যন্ত তিনি মেজর আতামস্সাহেবের সঙ্গে ছিলেন। ইংরাজ পক্ষে তাঁহার অনুরাগ ও কার্য্য নৈপুণ্য দর্শনে লর্ড ক্লাইভ তাঁহাকে কমিটির মুৎসুদ্দি পদে নিযুক্ত করেন। এ পদে তিনি ভেরেলষ্ট সাহেবের টিপ্পনী-"নবকৃষ্ণ গভর্ণরের মুৎসুদ্দি ছিলেন” এ কথা বলাতে বোল্ট সাহেবের ভ্রম হইয়াছে-“কমিটি এ দেশীয় রাজা রাজরাদিগের সহিত রাজকীয় কার্য্য সম্পন্ন করণার্থ তাঁহাকে আপনাদিগের প্রতিনিধিরূপে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ইং ১৭৬৫ অব্দে মুন্সি নবকৃষ্ণ লর্ড ক্লাইভের সহিত প্রয়াগে গমন করিলে শাহ আলম পাদশাহ তাঁহার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া হিঃ ১১৭৯ অব্দের ২রা শোওয়াল তারিখে রাজাবাহাদুর ও মসনব ওঞ্চহাজারী উপাধিসহ বিবিধ সম্মানসূচক রাজপ্রসাদ প্রদান করেন৷ সম্রাট সেই দিবস তাঁহার অগ্রজদ্বয়কে রায় ও মসনব একহাজারী উপাধি প্রদান করেন। ইহা ব্যতীত নবকৃষ্ণ অযোধ্যার নবাবের নিকট হইতে বিশিষ্টরূপে খেলয়ৎ ও অন্যান্য সম্ভ্রম চিহ্ন প্রাপ্ত হন।

অনন্তর লর্ড ক্লাইভ কলিকাতায় ফিরিয়া একদা কৌন্সিল গৃহে বসিয়া নবকৃষ্ণকে সমুচিত রূপে পুরস্কৃত করিবার নিমিত্ত স্বগণসহ পরামর্শ করিতেছেন, এমন সময় আরকাটের নবাব প্রেরিত একপত্র আসিয়া উপস্থিত হইল। লর্ড ক্লাইভ নবকৃষ্ণকে ঐ পত্র পাঠ করিতে আজ্ঞা করিলে তিনি দেখিলেন যে, তাহা তাঁহার অনিষ্ট হেতু লিখিত হইয়াছে। অতএব কিছুকাল স্তব্ধ থাকিয়া সে সমুদয় পাঠ করিলেন। পত্রের মর্ম্ম, যথা—

"আমার মানস এই যে ইংরাজ কোম্পানীর সহিত বিগ্রহ শেষ হইয়া উভয়তঃ সন্ধি সংস্থাপন ও প্রীতি প্রকাশ পূর্বক কালহরণ করা যাইবে, কিন্তু কোম্পানীর কার্য্যকারক রাজা নবকৃষ্ণ আমার শত্রু মনিরুদ্দিন খাঁর সহচর মৃত দেওয়ান রামচরণের পুত্র বিধায় প্রস্তাবিত সন্ধি বিষয়ে প্রতিবন্ধকতা করিবে। অতএব যে পর্য্যন্ত রাজা নবকৃষ্ণ উক্ত পদস্থ থাকে সে পর্য্যন্ত শান্তি সংস্থাপন হওয়া সুদূর পরাহত।”

লর্ড ক্লাইভ পত্রের মর্ম্ম অবগত হইয়া রাজা নবকৃষ্ণকে কিছুকালের জন্য উক্ত গৃহাভ্যন্তরে যাইতে অনুমতি করিলেন। সেখানে তিনি মহাসঙ্কুচিত চিত্তে চিন্তা করিতে লাগিলেন, এইক্ষণেই আমি কৰ্ম্মচ্যুত হইব। লর্ড ক্লাইভ কিছুকাল সহকারীগণের সহিত কথোপকথন করিয়া রাজা নবকৃষ্ণকে পুনরায় আহ্বান পূর্বক কহিলেন-“তুমি আমাকে কিজন্য এ কাল পর্য্যন্ত বিজ্ঞাপন কর নাই যে, তুমি এই প্রকার সম্ভ্রান্তবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছ? কোম্পানী তোমার কৰ্ম্মনৈপুণ্যে অনেক উপকার প্রাপ্ত হইয়াছে কিন্তু তোমার বংশ মর্য্যাদার বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকায় আমরা তোমার যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করিতে পারি নাই। এই দিন হইতে তোমাকে মহামহিম কোম্পানীর দেওয়ানী পদে অভিষিক্ত করিলাম—অতঃপর অতিশীঘ্র উপযুক্ত মত উপাধি ও খেলয়ৎ প্রভৃতি প্রদান করা যাইবে।”

ইং ১৭৬৬ অব্দে লর্ড ক্লাইভ শাহ আলম পাদশাহের নিকট হইতে নবকৃষ্ণের জন্য দশহাজারী ও মহারাজা উপাধি প্রদানীয় সনন্দ আনাইয়া তাঁহাকে পুরস্কৃত করেন। যথা -

সনন্দ

তৎপ্রদানোপলক্ষে লর্ড মহোদয় বিলাতীয় কর্তৃপক্ষের অভিমতানুসারে তাঁহাকে পারশ্যাক্ষরমালা ও উক্ত মহোদয় এবং কোম্পানীর অভিজ্ঞান অর্থাৎ মুকুট ও অস্ত্রাদিখচিত স্বর্ণপদক প্রদান করেন। তাহাতে তাঁহার সাধুতা এবং কৃতজ্ঞতার বিস্তর প্রশংসাবাদ লিখিত আছে। যথা -

মুদ্রা

উক্ত স্বর্ণপদক ব্যতীত তিনি কোম্পানীর পক্ষ হইতে দশ পর্চার খেলয়ৎ আর তার সম্মানসূচক পুরস্কার প্রাপ্ত হন—সে সকলের বর্ণনা বাহুল্য মাত্র৷ তাঁহার গৃহদ্বারে সিপাহীর পাহারা নিযুক্ত হয় ও তাঁহার ব্যয় নির্বাহ নিমিত্ত মাসিক দুই সহস্র টাকা তংখা নিৰ্দ্ষ্টি হয়। রাজা নবকৃষ্ণ মিনতি পূর্বক উক্ত তংখা গ্রহণে অসম্মত হন। তিনি লর্ড বাহাদুরের অনুগ্রহের প্রতি ধন্যবাদ পূর্বক কহিলেন,—আপনার প্রসাদাৎ আমার কিছুর অভাব নাই, অতএব অনর্থক কোম্পানীর কোষ হইতে এতাধিক অর্থাকর্ষণ করা আমার কর্তব্য নহে।”

লর্ড ক্লাইভ তাঁহার এই উক্তিতে সন্তুষ্ট হইয়া উক্ত মাসিক বৃত্তি তাঁহার পুত্র পৌত্রাদি ক্রমে নির্দ্দিষ্ট করিয়া তাঁহার হস্ত ধরিয়া হস্তির উপর আরোহণ করাইলে সভাভঙ্গ হইল। মহারাজা নবকৃষ্ণ মহা আড়ম্বরে গভর্ণমেন্ট হাউস হইতে স্বগৃহে প্রত্যাগমন করেন। কলিকাতায় সেরূপ ঘটা বহুকাল হয় নাই।

এই স্থলে ইহাও বক্তব্য যে, গোবিন্দপুরে নূতন দুর্গ নির্মাণ অবধারিত হইলে সেখানকার অন্যান্য পরিবারদিগের ন্যায় ব্যবহর্তা পরিবারও স্থান ভ্রষ্ট হইয়া তাহার পরিবর্তে আড়পুলীতে দশ বিঘা ভূমি ও বাটীর মূল্য ৫০০০ টাকা প্রাপ্ত হন। কিন্তু আড়পুলীতে ভূমির প্রতি রামসুন্দর ব্যবহর্তার বিরাগ থাকায় ১৭৬৩ অব্দে সুতালুটিতে এক বিঘা ভূমি ও একটি বাটী ক্রয় করিয়া বসতি করিলেন। ঐ বাটী পূর্ব্বে রামশঙ্কর ঘোষের ছিল—ঐ ভূমিখণ্ড মালকম্ নামক কোন সাহেবের ঋণ পরিশোধার্থ বিক্রীত হয়৷ ঐ বাটীই শোভাবাজারীয় রাজবাটীর আদ্যস্থান। মহারাজ নবকৃষ্ণ অনুমান ১৭৬৪ অব্দে উক্ত প্রাসাদ শ্রেণী নির্মাণ করাইতে আরম্ভ করিয়া ১৭৮০ অব্দে তাহা সমাপ্ত করান। এই স্থান পূর্ব্বে "পবনাবাগ” নামে খ্যাত ছিল। শঙ্কর ঘোষের বাটীর চতুদ্দিকে তিনি প্রথমতঃ বিংশতি বিঘা ভূমি ক্রয় করিয়া তাহাতে ঠাকুরবাটী, দেওয়ানখানা ও অন্তঃপুর প্রভৃতি বিবিধ খণ্ড নিৰ্ম্মাণ করাইয়া অবশিষ্ট ভূমিতে উদ্যান স্থাপন করিলেন। এই সমস্ত এখন রাজা রাধাকান্তের সম্পত্তি। আর তিনি রাস্তার দক্ষিণ ধারে আরও ১৬ বিঘা ক্রয় পূর্বক যে প্রাসাদ শ্রেণী নির্মাণ করান, সেখানে এখন রাজা শিবকৃষ্ণ ও তৎভ্রাতৃগণ বসতি করিতেছেন। পুরাতন বাটীতে যে নবরত্ন রহিয়াছে, তাহা মহারাজা নবকৃষ্ণের প্রধান মহিষী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শোভাবাজার রাজবাটীর পত্তন অবধি একাল পর্যন্ত তাহাতে কত কত নবাব, সুবাদার রায় রাঁয়া, রাজা প্রভৃতি ও লর্ড ক্লাইভ হইতে লর্ড অকল্যাণ্ড পর্যন্ত গভর্ণর জেনারেলগণ পদার্পণ পূর্বক তাহার সম্ভ্রম বৃদ্ধি করিয়াছেন। অধিকন্তু অট্টালিকা শ্রেণীতে বহুকাল পর্য্যন্ত গভর্ণমেন্টের অনেকানেক কার্যালয় উক্ত মহারাজার সদস্যতার অধীনে বর্তমান ছিল। যথা-মুন্সি দফতর, আরজ বেগি দফতর, ২৪ পরগণার তফশীল দফতর, জাতিমালা কাছারী; ২৪ পরগণার মাল আদালত এবং কোম্পানীর ধনকোষসে সময় ইহা মণি গুদাম নামে খ্যাত ছিল।

১৭৬৭ অব্দে লর্ড ক্লাইভ বিলাত যাত্রা করিলে পর ভেরেলষ্ট সাহেবের শাসন সময়ে মহারাজা নবকৃষ্ণ রাজকীয় ব্যাপার নির্বাহের দেওয়ানী পদে কিছুকাল অবস্থিত আছেন, এমন সময় তাঁহার মাতৃবিয়োগ হইল। মহারাজা নঃ ভূত নঃ ভাবি আড়ম্বরে তাঁহার আদ্যকৃত্য সম্পন্ন করেন। তাহাতে শত্রুবর্গ কৌন্সিলের কোন মেম্বরকে কহে-"রাজা নবকৃষ্ণ মাতৃশ্রাদ্ধে আপনার সর্বস্বান্ত করিয়া স্বীয়াধীন কোম্পানীর কোষ হইতে বহু লক্ষ ভাঙ্গিয়া কাঙ্গালী বিদায় করিতেছেন।”

মেম্বর মহোদয় সেই কথায় বিশ্বাস করিয়া ভেরেলষ্ট সাহেবকে বিজ্ঞাপন করেন। অনন্তর শ্রাদ্ধশান্তি পরে রাজা নবকৃষ্ণ গভর্ণর সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলে সাহেব রহস্য ছলে বলিলেন—“আমি শুনিলাম তুমি নির্বদ্ধিতাপূর্ব্বক তোমার মাতৃশ্রাদ্ধে আপনার সর্বস্ব বিনষ্ট করিয়াও ক্ষান্ত না হইয়া কোম্পানীর কয়েক লক্ষ টাকা নাকি অপচয় করিয়াছ।” রাজা তাহা শ্রবণমাত্র মেঝের উপর চাবি ধরিয়া দিয়া কহিলেন—“এই দণ্ডেই জনৈক কাউন্সিলের মেম্বর আমার নিন্দাবাদককে সঙ্গে লইয়া গিয়া মণি গুদাম পরীক্ষা পূর্বক বাকি বুঝিয়া লউন।”

ভেরেলষ্ট সাহেব বহুতর সান্ত্বনা বাক্যে তাঁহাকে শান্ত করিতে চেষ্টা পাইলে রাজা কহিলেন-“আমার চরিত্র ক্ষালনার্থ রাজকোষ পরীক্ষা করা নিতান্ত প্রয়োজন হইয়াছে।”

ভেরেলষ্ট সাহেব পুনর্বার কহিলেন—“আমি নিশ্চয় জানি কোষ মধ্যে সামান্যমাত্রও ব্যতিক্রমের সম্ভাবনা নাই। আমি তোমার সচ্চরিত্রতার প্রতি সন্দেহমাত্র রাখি না।”

তাহার উত্তরে রাজা কহিলেন-“যে পর্য্যন্ত উক্ত কোষ পরীক্ষা না হইবে সে পর্য্যন্ত আপনার এবং আমার চরিত্রের উপর কলঙ্ক আরোপিত হইবে। পরিশেষে রাজার দ্রাঢ্য হেতু ভেরেলষ্ট সাহেব অগত্যা উক্ত কোষ পরীক্ষা নিমিত্ত জনৈক মেম্বরকে প্রেরণ করিলেন। তিনি পরীক্ষান্তে গভর্ণর সাহেবকে কহিলেন-“কোম্পানীর তহবিলের কড়াক্রান্তি মাত্র গরমিল নাই-বরং তন্মধ্যে রাজার নিজ হিসাবে ৭ লক্ষ টাকা আমানৎ আছে।” ভেরেলষ্ট সাহেব উহাতে লজ্জিত হইয়া ক্ষমা প্রার্থনা পূর্ব্বক রাজার হস্তে পুনরায় চাবি প্রদান করিলে তিনি তাহা পুনগ্রহণে অস্বীকার করিয়া কহিলেন—“যখন আমার বিরুদ্ধে তহবিল ভঙ্গ করণের অভিযোগ উপস্থিত হইয়াছিল, আপনি তখনি আমাকে কারারুদ্ধ করিতে পারিতেন কিন্তু তাহার পরিবর্তে আপনি আমার প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করিয়াছেন। কিন্তু এরূপ অনুগ্রহ প্রত্যেক গভর্ণর আমার প্রতি প্রদর্শন করিবেন—এমন সম্ভাবনা নাই। অতএব কোম্পানীর বাহাদুরের অধীনে আমি যে সকল গুরুতর কার্য্যের ভারে দায়ী আছি, সেইসকল ভার হইতে এক্ষণে মুক্ত হই—এই আমার প্রার্থনা।”

পর দিনই রাজা স্বীয় বাটী হইতে সমুদয় দফতর উঠাইয়া আনিয়া গভর্ণর সাহেবের সমীপে সেই সকল প্রদান পূর্ব্বক রাজ-কার্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন।

রাজা নবকৃষ্ণ ইংরাজদিগের প্রাচীন সমাধিস্থাপনের ভূমি ব্যতীত তৎসংলগ্ন অতিরিক্ত ৬ বিঘা জমি সেণ্টজনস্ কাথিড্রাল গীর্জা নির্মাণের নিমিত্ত প্রদান করেন। এই স্থানে পূর্বতন দুর্গের অস্ত্রালয় ছিল। সে সময় ইহার মূল্য ৪৫০০০ টাকা নিরূপিত হয়৷ তিনি এক লক্ষ টাকা ব্যয়ে বেহালা হইতে কুলপি পর্য্যন্ত অন্যূন ১৬ ক্রোশ পথ নিৰ্ম্মাণ করিয়া দেন—তাহা এখন রাজার জাঙ্গাল নামে খ্যাত আছে৷ ইহা ব্যতীত শোভাবাজার রাজবাটীদ্বয়ের মধ্যবর্তী বর্মনিৰ্ম্মাণেও তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন, কারণ ঐ বর্মের জন্য সমধিক মূল্য দিয়া ভূমি ক্রয় করিতে হইয়াছিল। তিনি জীবৎমানে স্বীয় ব্যয়ে প্রতি বৎসর ঐ পথের সংস্কার করাইতেন।

রাজা নবকৃষ্ণ ইং ১৭৮০ অব্দে বর্দ্ধমান জেলার বন্দোবস্তি ভার গ্রহণ পূর্ব্বক মহারাজা তেজচন্দ্র বাহাদুরের অপ্রাপ্ত ব্যবহার কাল পর্য্যন্ত তাঁহার বিষয় রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত হন। তাহাতে স্বীয় কোষ হইতে ৮,৭৪,৭২০ টাকা প্রদান পূর্বক বর্দ্ধমানাধিপতির অধিকার রক্ষা করিয়া পরিশেষে ক্রমে ক্রমে তাহা পরিশোধ করিয়া লন৷ তিনি স্বীয় নৌপাড়া নামক তালুক কোম্পানীকে প্রদান পূর্বক তাহার পরিবর্তে সুতালুটি, হোঁগলকুড়িয়া ও বাগবাজার প্রভৃতি কোম্পানীর সাবেক জমিদার পুরুষানুক্রমে ভোগাধিকার করিবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হন। ইহাতে এদেশীয় ধনীমাত্রই প্রায় রাজা নবকৃষ্ণের প্রজা হওয়ায় অপমান জ্ঞানে একবাক্যে তাঁহার বিরুদ্ধে গভর্ণমেন্টে এই অভিযোগ উপস্থিত করিলেন যে, নূতন ভূস্বামী তাঁহাদিগের উপর অত্যন্ত অত্যাচার আরম্ভ করিয়াছেন। অতএব তাঁহারা তাঁহার নিকট কর প্রদান না করিয়া পূর্বৎ গভর্ণমেন্টের নিকট তাহা প্রদান করিবার প্রার্থনা করেন। সে সময়ে রেভেনিউ বোর্ডের অধ্যক্ষগণ সকলেই কৌন্সিলের মেম্বর হওয়ায় প্রার্থীদিগের ধৃষ্টতা বুঝিয়া এই আদেশ বিধান করিলেন; তাঁহাদিগের অনিবার্য্য ইচ্ছা এই যে প্রার্থকেরা রাজা নবকৃষ্ণের নিকট প্রদান করিবেন। কোনরূপে কেহ ইহার বিপর্য্যয় করিতে পারিবেন না।

রাজা নবকৃষ্ণ একজন অগ্রগণ্য পণ্ডিত-বন্ধু ছিলেন। বাঙ্গালাদেশের ও পশ্চিম প্রদেশের প্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাঁহার সভাস্থ হইতেন। সুবিখ্যাত জগন্নাথ তর্ক-পঞ্চানন এবং বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার তাঁহার সভাশোভনের প্রকৃষ্ট রত্ন ছিলেন। সভাতে নানা শাস্ত্র বিষয়ক বাকবিতণ্ডা উপস্থিত হইলে তাহাতে যাঁহারা জয়লাভ করিতেন, তাঁহাদিগকে রাজা আশার অতীত পুরস্কার প্রদান করিতেন। তিনি ভারতবর্ষের নানাদেশ হইতে বহুমূল্য দুর্লভ সংস্কৃত ও পারশ্য গ্রন্থসকল আনিতে ব্যয়ের অবশেষ রাখিতেন না। সেই সকল গ্রন্থের সুচারু অক্ষর মালার প্রতিলিপি করাতে তাঁহার বিষয় বিভবাদির মধ্যে ঐ সকল গ্রন্থ অতুল্য ও অমূল্য রূপে পরিগণিত হইয়াছে৷

তিনি তৌর্য্যত্রিকের একজন অগ্রগণ্য প্রেমিক ছিলেন। কোন কার্য্যোপলক্ষ হইলে দূরদূরান্তরবর্তী রাজন্যবর্গের সভা হইতে গায়ক গায়িকাগণ শোভাবাজারের রাজ নিকেতনে আসিয়া গুণ প্রদর্শন পূর্বক যথাযোগ্য পুরস্কার লাভে পরিতুষ্ট হইয়া যাইত।

ইহার উপর তাঁহার পৌত্র রাজা রাধাকান্তের সহিত রামকান্ত সিংহ চৌধুরী নামক কায়স্থ গোষ্ঠীপতির কন্যার পরিণয় সম্পাদন ও তদুপলক্ষে বিস্তর ব্যয়ে ঘটক কুলিনের এক-যাই করাতে সকলে তাঁহাকে গোষ্ঠীপতিত্বে বরণ করিয়া তদবধি সর্বাগ্রে মাল্য চন্দন প্রদান করিতে লাগিলেন।

রাজা নবকৃষ্ণ কত বড় ধনবান হইয়া উঠিয়াছিলেন তাহার যদিও বহু দৃষ্টান্ত আছে কিন্তু তন্মধ্যে নিম্নলিখিত বিষয়টি সাধারণের মধ্যে সুপ্রাপ্য নহে। মেজর আতামস্ সাহেব একদা মীরকাশেমের সহিত যুদ্ধ করিতেছেন এমন সময়ে ইংরাজ শিবিরে গুলির অনটন হইলে রাজা নবকৃষ্ণ সাহেবকে বলিলেন “আমার সঙ্গে এত রৌপ্য মুদ্রা আছে যে সেগুলি বহুক্ষণ পর্য্যন্ত গুলির কার্য্য করিতে পারে।”

মেজর সাহেব নবকৃষ্ণের অভিমতে উক্ত মুদ্রারাশি বর্ষণ পূর্বক সেদিন যুদ্ধে জয়লাভ করিয়াছিলেন।

গোবিন্দপুরের দুর্গ নির্মাণ কালে মৃত্তিকা খনন করিতে বেদনাগর অক্ষরাঙ্কিত এক খণ্ড তাম্রপত্র প্রকাশ পাইলে হেষ্টিংশ সাহেব রাজা নবকৃষ্ণকে তাহার অর্থ উদ্ধার করিবার ভার অর্পণ করিলেন। রাজার অনুমত্যানুসারে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন তাহার অর্থজ্ঞাপন করিলে জানা গেল, তাহা রাজা রামচন্দ্রের কৃত এক খণ্ড দানপত্র৷ রাজা জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননকে গভর্ণর জেনারেলের নিকট লইয়া যাইতে উদ্যত হইলে ভট্টাচার্য্য ম্লেচ্ছের দান গ্রহণ আশঙ্কায় তাহাতে বিরত হইলেন। বাণেশ্বর বিদ্যারঙ্কারকে কহিলে তিনিও উক্ত আপত্তি করিলেন। পরিশেষে রাধাকান্ত তর্কবাগীশ নামক জনৈক পণ্ডিত সম্মত হইয়া মহারাজার সহিত হেষ্টিংশ সাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়া অর্থ করিয়া দিলে সাহেব তাঁহাকে কলিকাতার পার্শ্ববর্তী এক সহস্র বিঘা ভূমি পুরস্কার করিলেন।

এই সময়ে মহারাজ নবকৃষ্ণের খ্যাতি প্রতিপত্তির কথা কি উল্লেখ করা যাইবে। পার্লামেন্ট মহাসভায় হেষ্টিংশ সাহেবের পরীক্ষাকালে লর্ড থর্লো সাহেব তাঁহার বিষয়ে এইরূপ উক্তি করেন-"নবকৃষ্ণ হেষ্টিংশ সাহেবের পারস্য শিক্ষক ছিলেন। সে সময়ে তাঁহারা উভয়েই যৌবন প্রাপ্ত। নবকৃষ্ণের এক্ষণে যে অত্যুচ্চপদ, সম্মান ও অতুল ঐশ্বর্য্য প্রভৃতি হইয়াছে, তাহা হেষ্টিংশের সহিত তাঁহার সংযোগের উপরই নির্ভর করিয়াছে; যেহেতু তদ্দ্বারাই তিনি লর্ড ক্লাইভের নিকট পরিচিত হন ফলে ক্লাইভের শাসনকাল পর্যন্ত মহম্মদ রেজা খাঁ ব্যতীত নবকৃষ্ণের তুল্য রাজকীয় পরাক্রম ও লাভ সূচক পদধারণ বিষয়ে আর কেহই তাঁহার তুল্য ছিল না।

এইরূপে মহারাজা নবকৃষ্ণ অতুলিত খ্যাতি প্রতিপত্তি, ধন সম্পত্তি ও সুখ সম্ভোগান্তর স্থাবর-অস্থাবর বিপুল বিষয় স্বীয় উত্তরাধিগণের প্রতি পরিত্যাগ পূর্বক ইংরাজী ১৭৯৭ অব্দের ২২শে নভেম্বর তারিখে মানবলীলা সম্বরণ করিলেন।

মহারাজা নবকৃষ্ণ স্বীয় পুত্ররত্নে চরিতার্থ না হওয়ায় নৈরাশ্য বশতঃ হিন্দুদায় মতে স্বীয় অগ্রজ রামসুন্দর ব্যবহর্ডার পুত্র গোপীমোহনকে পোষ্যপুত্রত্বে গ্রহণ করেন কিন্তু পুত্র প্রতিগ্রহের পর তাঁহার এক ঔরস পুত্র জন্ম গ্রহণ করিলেন-তাঁহারই নাম রাজা রাজকৃষ্ণ। রাজা নবকৃষ্ণের মৃত্যুর পর বিষয় বিভাগ লইয়া উভয় ভ্রাতার দ্বন্দ্ব উপস্থিত হইলে সুপ্রীম কোর্টের বিচারে তাহার নিষ্পত্তি হয়—তদনুসারে উভয় ভ্রাতা তুল্যাংশ প্রাপ্ত হন।

গোপীমোহন দেব কৌন্সিলের মেম্বর স্টবস্ সাহেবের প্রথমতঃ দেওয়ান ছিলেন তৎপরে প্রধান সেনাপতি স্যর জেমস্রিবেট কার্ণক সাহেবের দেওয়ানী করিয়া পরিশেষে গভর্ণর জেনারেল স্যর জন্ ম্যাকারসন্সাহেবের দেওয়ান পদ ধারণ করেন। তিনি স্বীয় কর্তব্য সুচারুরূপে নির্বাহ করিয়া প্রভুদিগের প্রিয় হইয়াছিলেন৷ উক্ত মহাশয় পারশ্য বিদ্যায় ব্যুৎপন্ন ছিলেন এবং সংস্কৃত ন্যায়াদি দার্শনিক শাস্ত্রে এরূপ কুশাস্ত্র প্রমিত সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি ধরিতেন যে সে সময়ের প্রধান প্রধান নৈয়ায়িকগণ যে সকল কঠিন কূট উপস্থিত করিতেন তিনি অনায়াসে সে সকলের মীমাংসা করিয়া দিতেন। ইউরোপীয় ভূগোল ও খগোল বিদ্যার প্রতি তাঁহার বিশেষ অনুরাগ ছিল। ঐ দুইটি শাস্ত্রে তাঁহার কিরূপ পারদর্শিতা ছিল তাহা ইহাতেই প্রকাশ পাইতেছে যে তিনি স্বীয় অধীনস্থ কারিকরদিগের দ্বারা ভূমণ্ডল নক্ষত্র মণ্ডলের প্রতিকৃতি নিৰ্ম্মাণ করাইয়াছিলেন। তিনি প্রত্যেক বর্ষ, মাস,দিন, বার, তিথি প্রভৃতি প্রদর্শনীর আর একটি যন্ত্রের সৃষ্টি করিতেছিলেন কিন্তু তাহা সমাপ্ত করিয়া যাইতে পারেন নাই। গোপীমোহনও রাজা নবকৃষ্ণের ন্যায় গুণী জ্ঞানী ও গায়ক গায়িকাদিগের মধ্যে পুরস্কার বিতরণে কার্পণ্য করিতেন না। তাঁহার নিরপেক্ষতার এরূপ খ্যাতি ছিল যে, দেশীয় কোন ভদ্র পরিবারে অথবা অন্য কোন স্থলে কোন প্রকার বিবাদ বিসম্বাদ হইলে তাঁহাকেই মধ্যস্থ রূপে মান্য করিতেন৷ তাঁহার দান শৌণ্ডতা সর্বত্র বিখ্যাত আছে, তাঁহার মুখশ্রী এমন গাম্ভীর্য্য ভাবাপন্ন ছিল যে নিরতিশয় দুর্দ্ধর্ষ পুরুষেরাও তাঁহার নিকট গমন করিলে সভয়ে অবস্থান করিতে বাধ্য হইল।

লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক বাহাদুর তাঁহার কাছে সর্বদাই অতি গুরুতর রাজকীয় বিষয়ে পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিতেন। তাহাতে তাঁহার বুদ্ধির চৈক্কন্য এবং অনুভব শক্তির গভীরতা ও বহুদর্শিতা প্রভৃতি গুণ গরিমা দৃষ্টে বিশিষ্ট রূপে পরিতুষ্ট হইয়া ৭ পর্চা খেলয়েৎ ও অন্যান্য রাজপ্রসাদ সহ রাজা বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। ইহা ব্যতীত তাঁহার শরীর রক্ষার্থ ছয়জন শস্ত্রধারী পুলিশের প্রতি আজ্ঞা অর্পিত হইয়াছিল। রাজা গোপীমোহন দেব ৭৫ বৎসর বয়ঃক্রম বাং ১২৪৩ অব্দের ৩রা চৈত্র তারিখে পরলোক গমন করেন।

রাজা গোপীমোহনের একমাত্র পুত্র রাধাকান্ত দেব। ইনি ১৭০৫ শকের ১লা চৈত্র-দিবসে সিমুলিয়াতে স্বীয় মাতুল গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। এই মহাশয় অতি অল্প বয়সে বিদ্যানুসন্ধানে অসাধারণ পরিশ্রম ও উৎসাহ পরবশ গভর্ণমেন্ট হাউসে প্রথম যেদিন গমন করেন সেই দিনই খেলয়েৎ প্রাপ্ত হন এবং ১৮৩৭ অব্দের ১০ই জুলাই দিবসে লর্ড অকল্যাণ্ড বাহাদুর তাঁহাকে ৭ পর্চা খেলয়েৎ ও তদুপযুক্ত মাওরা ও সজ্জাসহকারে রাজা বাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। রাজা রাধাকান্ত বাহাদুর সর্বাগ্রে ইউরোপীয় নিয়মে বাঙ্গালা বর্ণমালা রচনা করেন ও পারশ্য ভাষা হইতে উদ্যান বিদ্যা বিষয়ক এক গ্রন্থের ইংরাজী অনুবাদ প্রকাশ করেন্ কিন্তু সর্বাপেক্ষা তাঁহার প্রধান কীর্তি শব্দকল্পদ্রুম নামক প্রসিদ্ধ অভিধান। আরও এই মহাশয় গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যাণ্ড রয়েল আসিয়াটিক সোসাইটি নামক অদ্বিতীয় বিজ্ঞানাদি ব্যুৎপন্ন মহাশয় মণ্ডলীর মেম্বর ছিলেন। ইহা ব্যতীত হিন্দুকলেজ সংস্থাপনে স্যর হাইড ঈষ্ট সাহেবের সহিত ইনি বিহিত পরিশ্রম করিয়াছিলেন। বিদ্যা ও বুদ্ধিমত্তার অপরাপর নিদর্শন এস্থলে প্রদর্শন বাহুল্য মাত্র। তাঁহার এতাধিক গুণগৌরব হেতু কলিকাতায় প্রায় এমন কোন সদনুষ্ঠান নাই যাহাতে তিনি অধ্যক্ষতা বা সভাপতিত্ব পদ না পাইয়াছেন। নিম্নলিখিত তালিকায় তাঁহার কতিপয় পদের সমষ্টি দেওয়া হইল:-

হিন্দু কলেজ-ডিরেক্টর।

স্কুল বুক সোসাইটি—মেম্বর।

স্কুল সোসাইটি-মেম্বর ও সেক্রেটারী।

আসিয়াটিক সোসাইটি-মেম্বর।

বঙ্গ ভাষানুরাগ সমাজ-মেম্বর।

আসাম টি (চা)কোম্পানী—মেম্বর।

কলিকাতা কৃষিসমাজ—সহকারী সভাপতি।

ভূম্যধিকারী সভা—সভাপতি।

ভারতবর্ষীয় সভা—সভাপতি।

বিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ—সভাপতি।

হিন্দুহিতৈষিণী সভা—সভাপতি। ধৰ্ম্মসভা-সভাপতি।

রাজা রাধাকান্ত বাহাদুর অগ্নিপুরাণ সম্মত যামিনীর দ্বিপ্রহর হইতে যামিনীর দ্বিপ্রহর পর্য্যন্ত ২৪ হোরায় দিবা-নিশা বিভাগের নিয়ম প্রকাশ করাতে গ্রেট ব্রিটেন ও আয়র্লণ্ডের রয়েল আসিয়াটিক সোসাইটি তাঁহাকে উক্ত সভায় অধ্যক্ষপদ ধারণার্থ এক সুরুতি পত্র প্রেরণ করেন।

শব্দকল্পদ্রুম মহাভিধানের উৎপত্তি বিষয়ে রাজা বাহাদুর আমার প্রতি যে পত্র লেখেন, তাহার এক স্থানে এরূপ লিখিত আছে:-

“আমার তরুণাবস্থায় সংস্কৃত ভাষাধ্যয়ন ও পুরাণ শ্রবণ কালে সুকঠিন শব্দ সমূহের অর্থাদি ঘটিত টিপ্পনী লিখিয়া লইয়া স্বকীয় ব্যবহারার্থ নিয়োগ করিতাম, অনন্তর মান্য সমুদয় কোষ হইতে শব্দ সংগ্রহ পূর্ব্বক একত্র করত আকারাদি ক্ষকারান্ত নিয়মে এক সংস্কৃতাভিধান প্রকাশ করণের ইচ্ছা হইল; পরে ক্রমে ক্রমে তাহা অতি বৃহৎ পরিমাণ হইয়া উঠে যাহাতে ১৭৪৩ শকে তাহার প্রথম খণ্ড প্রকাশ করি এবং তাহার অর্থাৎ সপ্তম খণ্ড ১৭৭৩ শকে প্রচারিত হয়—ইহার পরিশিষ্ট এইক্ষণে যন্ত্রস্থ রহিয়াছে-অতি শীঘ্র প্রকাশ পাইবেক। গ্রেট-ব্রিটেন ও আয়র্লণ্ডের রয়েল আসিয়াটিক সোসাইটি এই শব্দকল্পদ্রুমকে সংস্কৃত ভাষায় অখিলাভিধান পদে বাচ্য করিয়াছেন, এই গ্রন্থ যখন প্রথম প্রকাশ করি তখন ইহাই বাসনা ছিল, স্বদেশীয় লোকের সচরাচর ব্যবহার্থ ইহা উপকারে আসিবেক; কিন্তু সম্প্রতি অদ্ভুত মানিতেছি যে, ভারবর্ষের এবং ইউরোপ ও আমেরিকার সর্ব প্রদেশ হইতে প্রশংসা লিপি আসিতেছে।”

ঠাকুর বংশ

এই বংশের আদি পুরুষ জগন্নাথ ঠাকুর যশোহর জিলার অন্তঃপাতি...ইশবপুর নিবাসী সুধারাম নামক জনৈক পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ভূম্যধিকারীর তনয়ার পাণিপীড়ন করাতে কুল কলুষিত করিয়া “পিবালী” অপবাদ প্রাপ্ত হন। তাঁহার বৃদ্ধ প্রপৌত্র পঞ্চানন ঠাকুর গোবিন্দপুর গ্রামে আসিয়া বাস করেন। অতএব কলিকাতার উন্নতি সময়ে ভিন্নস্থানীয় মনুষ্যেরা যে ঐ গ্রামে আসিয়াই অধিকাংশ বসতি করিতেন, তাহার বিলক্ষণ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। এক সময়ে গোবিন্দপুরই কলিকাতার প্রধান বাণিজ্য স্থল এবং সর্বাপেক্ষা জনাকীর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। কালক্রমে ইংরাজদিগের সহিত পঞ্চাননের আলাপ কুশল হইলে তাঁহারা তৎপুত্র জয়রামকে ২৪ পরগণার রাজস্ব আদায়ক আমীন পদে নিযুক্ত করেন। জয়রাম কোন ভূসম্পত্তি সঞ্চয় করিতে পারেন নাই। ঐ জয়রামের রাধাবল্লভ নামক জনৈক বংশধর গোপীমোহন ঠাকুর প্রভৃতির বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে এক দায় উপস্থিত করেন। তৎসংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠে জানা গেল যে কলিকাতা আক্রমণ কালে জয়রাম কিছু নগদ টাকা ব্যতীত সর্বস্বান্ত হইয়াছিলেন। তিনি ঐ টাকা দেবসেবায় অর্পণ করিয়া স্বীয় পুত্রদিগকে সেবায়েৎ পদে অভিষিক্ত করিয়া যান।

জয়রামের চারি পুত্র। জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠের বংশলোপ পাইয়াছে। মধ্যম পুত্রের নাম নীলমণি—ইনিই দ্বারকানাথ ঠাকুরের পিতামহ। তৃতীয় পুত্রের নাম দর্পনারায়ণ ঠাকুর। ইঁহার সাত পুত্র যথারাধামোহন, গোপীমোহন, কৃষ্ণমোহন, হরিমোহন, পেয়ারীমোহন, লাডলীমোহন এবং মোহিনীমোহন৷ এই সপ্তভ্রাতা মধ্যে গোপীমোহন ঠাকুর মহা বিখ্যাত হন। ইঁহার সৌভাগ্যসম্পদ ও যশোপ্রভাবে ঠাকুর বংশের গৌরব চন্দ্রিকা অতিশয় সমুজ্জ্বল হইয়া উঠে। গোপীমোহনের ষড়তনয়ের মধ্যে প্রসন্নকুমার ঠাকুর গুণ গরিমার সর্বত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছেন। ইংলণ্ডীয় রাজপুরুষদিগের নিকটে যে সকল মহাশয়েরা সর্বাগ্রে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করেন তন্মধ্যে দর্পনারায়ণ ঠাকুরও গণ্য হন। সুবিখ্যাতা রাণী ভবানী রাজসাহী, দিনাজপুর, যশোহর এবং রঙ্গপুর প্রভৃতি জেলার অধিকাংশে অধিকার রাখিতেন। তাঁহার প্রাচীনত্ব ও অন্যান্য হেতু বশতঃ কাৰ্য শৈথিল্যে বাকি খাজানার দায়ে ঐসকল ভূসম্পত্তির কিছু কিছু অংশ বিক্রীত হইতে লাগিল। সর্বাগ্রে উত্তর স্বরূপপুর পরগণা দর্পনারায়ণ ঠাকুর অতি অল্প মূল্যে ক্রয় করেন৷ ইহার বাৎসরিক আয় ১৩,০০০ টাকা মাত্র ছিল। ক্রমশঃ রঙ্গপুর, দিনাজপুর, রাজসাহী, যশোহর এবং অন্যান্য স্থানের ভূস্বামীদিগের অধিকার নীলাম হইতে থাকিলে গোপীমোহন ঠাকুর এবং তাঁহার সহোদরেরা প্রচুর মূল্য প্রদান পূর্ব্বক সে সকল ক্রয় করিয়া অতি প্রসিদ্ধ ভূম্যধিকারী হইয়া উঠেন।


অষ্টম অধ্যায়

কলিকাতার পুরাণ পল্লীনির্ণয়—ডিহি কলিকাতা—গোবিন্দপুরসুতালুটিবাজার কলিকাতা:-বাগবাজার, শোভাবাজার, চার্লসবাজার, ধোপাপাড়া বাজার, শ্যামবাজার, নূতনবাজার, হাটখোলা, বড়তলা বাজার, হোঁগলকুড়িয়া, বড়বাজার, মেছোবাজার, ফৌজদারী বালাখানা, আম্মানীরাজার, মুর্গীহাটা, সন্তোষবাজার, তেরেটি বাজার, লাল বাজার, বৈঠকখানা, বাদা, শিয়ালদহ, বেনিয়াপুকুর, পাগলাডাঙ্গা, টেংরা, দোলণ্ডা, কালীঘাট, আলিপুর, বেলডিড়িয়া, টালির নালা—বিলাতী চক্র হাবড়া-শালিখা।

আমরা কলিকাতার প্রাচীনত্ব সপ্রাণপূর্ব্বক এক্ষণে তৎসংক্রান্ত কয়েকটি পল্লীর বিষয়ে কিছু বলিতেছি। ইহা দ্বারা ইহাই দেখা যাইবে যে কলিকাতার অন্তঃপাতি অনেক স্থানের নাম নিতান্ত আধুনিক নহে। নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার আগমনের অনেক পূর্ব হইতে ঐ সকল নাম পুরুষ পরম্পরা প্রচলিত হইয়া আসিতেছে। হলওয়েল সাহেব গোবিন্দরাম মিত্রের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ উপস্থিত করেন, সেই সকল অভিযোগ ঘটিত কাগজপত্র পাঠে প্রাগুক্ত স্থানাদির সবিশেষ বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। ফলতঃ তাহাতে ১৭৩৮ অব্দ পর্য্যন্তেরই সংবাদ লব্ধ হয়—তৎপূর্ব্বের সমাচার প্রাপ্তব্য নহে।

ইংরাজেরা কলিকাতায় বসতি পূর্বক তাহা চারি অংশে বিভক্ত করেন। যথা-ডিহি কলিকাতা, গোবিন্দপুর, সুতালুটি এবং বাজার কলিকাতা৷ এই সকল প্রত্যেক স্থানে বড়বাজারে এক এক কাছারী ছিল কিন্তু ডিহি কলিকাতার কাছারীতেই সমুদয় কাছারীর হিসাব নিকাষাদি হইত। এই চারি খণ্ডে সর্বশুদ্ধ ৫৪৭২৷৷০ বিঘা জমি ছিল, কোম্পানী টাকা হারে কর আদায় করিতেন। ইহা ব্যতীত দেবালয়, মসজিদ ও গীর্জ্জা প্রভৃতিতে ৭৩৩ বিঘা পর্যন্ত ভূমি ছিল। কোম্পানী তাহার কর গ্রহণ করিতেন না। আর নিম্নলিখিত কতিপয় পল্লী কলিকাতার সীমার মধ্যে থাকিলেও সেগুলির অধিকারীগণ করদান বিষয়ে কোম্পানীর অধীন ছিলেন না। তাহাদের বিবরণ:-

সিমলিয়া... ১০০০ বিঘা

মলঙ্গা... ৮০০ বিঘা

মৃজাপুর... ১০০০ বিঘা

হোগলকুঁড়িয়া... ২৫০ বিঘা

মোট- ৩০৫০ বিঘা

এই সকল নিষ্কর উভয় বিভাগে অনুমান ১৪,৭১৮ সংখ্যক বাটী ছিল৷ পূৰ্ব্বোক্ত মত বিভাগ হইবার তাৎপর্য, এই কোম্পানী যে ফাৰ্ম্মাণ পান, তাহাতে এমন নিৰ্দ্শে ছিল যে, তাঁহারা ভূম্যধিকারীদিগকে সন্তুষ্ট করিয়া পুর্বোক্ত স্থানাদি ক্রয় করিয়া লইবেন৷ ইহাতে ভিন্ন ভিন্ন ভূম্যধিকারীর নিকট হইতে ভূমি ক্রয় করিতে হয় সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন খণ্ড নির্মিত হইল৷ যে সকল ভূম্যধিকারী ভূমি বিক্রয়ে পরাজুমুখ থাকিলেন, তাঁহাদের অধিকার নিমিত্ত কোম্পানীকে কর দিতে হইত না।

ইং ১৭৩৮ অব্দ হইতে ১৭৫২ অব্দ পৰ্যন্ত কোম্পানীর অধিকারে নিম্নলিখিত বাজার ও হট্ট সমূহে নিম্নলিখিত আয় উৎপন্ন হইয়াছিল:-

গোবিন্দপুরের গঞ্জ অথবা মণ্ডিবাজার – ১৬৯,৯২১ টাকা

হাট সুতালুটি ও শোভাবাজার - ৬৫,০৩৭ ”

বাগবাজারের হাট ও বাজার, চার্লস্ বাজার, ধোপাপাড়াবাজার, হাটখোলাবাজার ও খড়ুয়াপোস্তা - ২৩,২৭১ টাকা

বড়বাজারপ্রথম অংশ - ৩৩,০৯১ ”

বড়বাজার-দ্বিতীয় অংশ - ২০,৭৫৪ יי

বড়বাজার—তৃতীয় অংশ - ১৬,৭৩৭ יי

গোবিন্দপুরের বাজার, বেগমবাজার ও গোষ্টতলাবাজার - ২৩,৪০৭ ”

লালবাজার ও সন্তোষবাজার دو ২,৭৫২ ”

সুতালুটির নিকম মহল - ৩০,১০৪

ডিহি কলিকাতার বাজার - ৯,১৫০ יי

শ্যামবাজার ও নূতনবাজার - ৩৪,৯২০ টাকা

জানবাজার ও বড়তলা - ১১,৪২১ টাকা

মোট – ৪,৬৫,৩১৬ টাকা

পরিলিখিত আয়ের সহিত এখনকার আয়ের তুলনা করিলে অদ্ভুত রসের সীমা থাকে না, অথচ এই পরিবর্তন ১৩০ বৎসরের মধ্যে হইয়াছে। কোম্পানী এই সকল হাট ও বাজারে সকল প্রকার দ্রব্যের উপর কর গ্রহণ করিতেন। তাহা ব্যতীত কাচ, হিঙ্গুল, কলাইকর, কালাপাতি, তামাকু, গাঁজা, সিন্ধুক, সীসা, চাসর, কায়ের, আতসবাজি, খেয়া প্রভৃতি নানাদ্রব্য ও বিষয়ের নিমিত্ত ভিন্ন ভিন্ন ইজারা বিলি হইত—তাহাতে সর্বসুদ্ধ ১৭৫২ অব্দে ৬৫,৫৯৯ টাকা উৎপন্ন হইয়াছিল৷ এই ন্যায্য আয় ব্যতীত নিম্নলিখিত মত অনিৰ্দ্ষ্টি উপার্জ্জনে কোম্পানীর বিস্তর আয় হইত। ইহাতে স্পষ্টই বোধ হইতেছে তাঁহারা সেকালের জমীদারদিগের ন্যায় অন্যায় উপার্জনের ত্রুটি করিতেন না।

অনির্দ্দিষ্ট উপার্জনের তালিকা

(১) বস্ত্রের উপর মাশুল (২) জরিমানা (৩) এত্তোলাদারীর তংখা (৪)নৌকা ও সুলুপ বিক্রীর তংখা (৫) দাস বিক্রয়ের তংখা (৬) পাট্টাসেলামী (৭) সোলেনামার তংখা (৮) ঋণ আদায়ের তংখা (৯) ছাড় মাত্রের তংখা (১০) বন্ধকী কওয়ালার তংখা (১১) বিবাহ সেলামী (১২) রসী সেলামী (১৩) সুলুম (১৪) মুহুরী আনা (১৫) সুরা রপ্তানীর মাশুল (১৬) উৎসব করণের সেলামী (১৭) বাদ্যকরণের সেলামী (১৮) তণ্ডুল রপ্তানীর মাশুলা

ইং ১৭৪৬ অব্দের জুন মাসে সিক্কা একটাকা বিঘাগারে খাজনা দিয়া নবদ্বীপাধিপতি প্রভৃতি ভূম্যধিকারীগণের নিকট হইতে ইংরাজেরা বেনীয়াপুকুর, পাগলাডেঙ্গা, টেঙ্গরা ও দোলণ্ডা এই কয়েক স্থান বন্দোবস্ত করিয়া লন। ঐ কয়েক স্থান জাননগর মণ্ডে নিবিষ্ট হয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের জনৈক গোমস্তা ঐ সকল স্থানের অন্তঃপাতী ৪২ বিঘা ভূমির জন্য কোম্পানীর কাছে বার্ষিক সেলামী চাহিয়া পাঠাইয়াছিল কিন্তু হলওয়েল সাহেব গভর্ণর ড্রেক সাহেবকে লেখেন এরূপ সেলামী দিলে কোম্পানীর অপমানের পরিসীমা থাকিবে না- অতএব তাহা না দেওয়া কর্তব্য। ইহা অপেক্ষা আর কমলার চঞ্চলতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ কি আছে? যে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ভৃত্যগণ কোম্পানীর কাছে সেলামী প্রার্থনা করিত, সেই কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের উত্তরাধিকারীগণকে এক্ষণে কোম্পানীর ভৃত্য অর্থাৎ গভর্ণর জেনারেল প্রভৃতিকে সেলাম প্রদান কল্পেও অন্য লোকের উপাসনা করিতে হয়।

পাঠক মহাশয়েরা উপরিলিখিত সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠ করিয়া বিবেচনা করুন—এখন কলিকাতায় যেমন অনেক নূতন নূতন হাট ও বাজারাদি প্রস্তুত হইয়াছে-তেমনি কতকগুলি বাণিজ্য স্থান একেবারে বিলুপ্ত হইয়াও গিয়াছে! যথা:—বেগম বাজার, গোষ্টতলা বাজার ইত্যাদি। তবে আমরা যে সকল হাট বাজারের কথা লিখিলাম, সেগুলি প্রথম অবস্থায় অধিকাংশ জঙ্গল ও জলাময় ছিল। গঙ্গাতীরেই ভদ্র লোকেরা বাস করিতেন; তাহার প্রমাণ কলিকাতার বুনিয়াদী বড় মানুষ বলিয়া যাঁহাদিগকে গণ্য করা যায়, তাঁহাদের সকলেরই আদ্য নিবাস আজিও গঙ্গাতীরে বর্তমান রহিয়াছে। এখন কলিকাতার মধ্যভাগে শেঠের বাগান, কলাবাগান, জোড়াবাগান, চোরবাগান প্রভৃতি যে সকল জনাকীর্ণ স্থান দৃষ্ট হয়, পূর্বে সে সকল স্থান আধুনিক বেলগাছিয়া, উল্টাডিঙ্গি, গড়পার, প্রভৃতি স্থানের ন্যায় উদ্যানময় পল্লী ছিল। সে সময় মেছুয়া বাজার অতি নিম্নভূমি ছিল৷ এখনও সমুদ্রের অপেক্ষা তাহার উচ্চতা ৮ ফিটের অধিক নহে। ফৌজদারী বালাখানা নামক প্রসিদ্ধ বাটীতে সে সময়ে হুগলীর মুসলমান শাসনকর্তা বাস করিতেন।

আরমানীরা কলিকাতা সংস্থাপনের প্রারম্ভ হইতে এই নগরে অবস্থিতি করিতেছে, সুতরাং আরমানী টোলা প্রাচীন স্থান মধ্যে গণনীয়৷ তাহাদিগের নাজিরথ নামক এক্ষণে যে গীর্জ্জা রহিয়াছে, তাহা ১৭২৪ অব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়—তাহার পূর্বে চীনাবাজারে তাহাদিগের একটি ক্ষুদ্র ধৰ্ম্মালয় ছিল। আরমানীরা প্রথম অবস্থায় ইংরাজদিগের গোমস্তাগিরি কার্য্য করিত।

আধুনিক ইউরোপীয়দিগের মধ্যে পর্তুগীজেরা এদেশে সর্বাগ্রে আগমন করে। ইং ১৫৩০ অব্দে তাহারা গৌড়নগরীয় ভূপতির অধীনে সৈন্য পরিচালনাদি কার্য্য করিত। চার্ণক সাহেব কর্তৃক কলিকাতা প্রতিষ্ঠিত হইবার পরেই তাহারা মুৰ্গীহাটায় আসিয়া বসতি করে। পূর্ব্বে পর্তুগীজদের এমন প্রাদুর্ভাব ছিল যে এদেশীয় লোকেরা ইউরোপীয় মাত্রের সহিত কথোপকথনে পর্তুগীজ ভাষা ব্যবহার করিতেন—সেজন্য ইংরাজ, ফরাসী, ওলন্দাজ ও দীনেমার প্রভৃতি সকল জাতীয় সাহেবদিগকে ঐ ভাষা শিক্ষা করিতে হইত। আজিও ইহার প্রমাণ স্বরূপ বাঙ্গালা ভাষায় অনেক পর্তুগীজ শব্দ সংযোজিত হইয়া গিয়াছে, যথা:- জানালা, ইস্কাবন, কেনারা, বারাণ্ডা, সিয়ঁর, পাঁও ইত্যাদি। কিন্তু কি আক্ষেপের বিষয় একসময়ে যাঁহারা ধরা মধ্যে অতি ধন্যমান্য বিশেষতঃ এদেশে ইউরোপীয়দিগের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন, তাঁহাদের বংশধর, বংশধরীগণ অধুনা বাবুর্চি ও আয়ার কাজ করিয়া উদর পোষণ করিতেছে।

ইং ১৭৮৮ অব্দে তিরেটা নামক একজন ফরাসী কর্তৃক তিরেটা (তেরিটি) বাজারের সৃষ্টি হয়। ঐ সাহেব কোম্পানীর রাস্তা ও ইমারতের সুপ্রীমটেণ্ডেন্ট ছিলেন। তাঁহার সময়ে ঐ বাজার হইতে মাসিক ৩৮০০ টাকা আয় হইত। পরে তেরিটি সাহেব দেউলিয়া পড়িলে তাঁহার উত্তমর্ণগণ ঐ মূল্য নির্দ্ধারণ পূর্বক ঐ বাজার লটারী দ্বারা বিক্রয় করেন। তেরেটি বাজারের অন্যধারে ওয়েষ্টন নামক একজন উদ্যমী, দাতা, সদাশয় সাহেবের বসতবাটী ছিল। তিনি প্রতিমাসে কলিকাতা নগরীর দুঃখী লোকদিগকে স্বহস্তে ১৬০০ টাকা দান করিতেন।

লালবাজার হইতে লালগীর্জ্জায় গমনীয় যে বর্ত এখন মিশন রো নামে খ্যাত হইয়াছে, তাহা পূর্ব্বে রোপওয়াক নামে প্রসিদ্ধ ছিল৷ ইং ১৭৬৮ অব্দে উক্ত গীর্জা কির্লাণ্ডার সাহেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়৷ এই গীর্জ্জা অপেক্ষা ইংরাজদিগের আর কোন গীর্জা পুরাতন নহে-এজন্য সাহেবরা তাহাকে পুরাতন গীর্জ্জা বলেন। ঐ গীর্জার পূর্ব্বে পুরাতন দুর্গ মধ্যে যে গীর্জা ছিল, তাহা মুসলমানেরা ভঙ্গ পূর্বক এক মসজিদ নির্মাণ করিয়াছিল। কির্লাণ্ডার সাহেব অর্দ্ধলক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া লালগীর্জ্জা নির্মাণ করান। সেই ব্যয় নির্বাহ নিমিত্ত তিনি স্বীয় বনিতার অলঙ্কারাদি বিক্রয় করিয়াছিলেন।

ইংরাজী গত শতাব্দীতে লালদিঘি নগরের মধ্যস্থল বর্তিনী বলিয়া বিখ্যাত ছিল। ইহাতেই তখনকার নগরের পরিসর কেমন ছিল, তাহা বিলক্ষণ হুদয়ঙ্গম হইবে। এই লালদিঘি খননের দিন নির্ণয় হয় না। কোন প্রাচীন গ্রন্থকার ১৭০২ অব্দে লেখেন যে, কলিকাতার গভর্ণর সাহেবের ফলমূল সঞ্চয়ার্থে একটি উদ্যান ও মৎস্য যোগাইবার নিমিত্ত কয়েকটি পুষ্করিণী আছে। বোধহয় লালদিঘি তন্মধ্যে কোন এক পুষ্করিণী হইতে পারে, কারণ প্রাচীন লেখকেরা তাহাকে “মৎস্য পুষ্করিণী” বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন।

ইং ১৭৮৭ অব্দে পাতরিয়া গীর্জা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ এই গীর্জা নির্মাণের নিমিত্ত রাজা নবকৃষ্ণ ভূমি ব্যতীত ত্রিশসহস্র টাকা দান করেন। ভগ্নাবস্থ গোড়নগর হইতে চার্লস গ্রান্ট সাহেব মার্বল ও অন্যান্য প্রকার মূল্যবান প্রস্তর আনাইয়া উক্ত ধৰ্ম্মাগারের শোভা বৃদ্ধি করেন। এই গীর্জার প্রাঙ্গণে কলিকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্ণক সাহেবের সমাধি রহিয়াছে।

নূতন গভর্ণমেন্ট হাউস নির্মাণের পূর্বে এখন যে স্থলে ট্রেজরি রহিয়াছে, সেই স্থানেই পুরাতন গভর্ণমেন্ট হাউস ছিল। ওয়ারেন হেষ্টিংশ সাহেব উক্ত ক্ষুদ্র গৃহে অধিবাস করিতেন কিন্তু তাঁহার পত্নী হেষ্টিংশ স্ট্রীট নামক বর্ম পার্শ্ববর্তী যে বাটীতে অধুনা বার্ণ কোম্পানীর অফিস রহিয়াছে সেই বাটীতে অবস্থান করিতেন। বর্ত্তমান ট্রেজরী বাটী টম, ই, কুট সাহেব কর্তৃক নিৰ্ম্মিত হয়।

ইং ১৭৯২ অব্দে টাউন হল নিম্মাণারম্ভ হয়৷ উহা নিৰ্ম্মাণকল্পে যে সভ্য হইয়াছিল, তাহাতে স্যর উইলিয়ম জোন্স মহোদয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। উক্ত অট্টালিকার নিমিত্ত ইউরোপীয় ও এদেশীয় ধনীগণ অর্থদান করেন। টাউন হলের পূর্ব্বে ঐ স্থানে যে বাটী ছিল সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি হাউড সাহেব ১২০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়া তাহাতে বাস করিতেন

সত্তর বৎসরাধিক হইল কসাইটোলা, খিদিরপুর প্রভৃতি শাখা নগরের ন্যায় গণনীয় ছিল৷ একশত বৎসর হইল তাহা জঙ্গলময় হওয়ায় সেখানে অতি অল্প লোক বাস করিত। ১৭৮০ অব্দ পর্যন্ত বর্ষাকালে সেখানকার পথ ঘোরতর পঙ্কিল হইবার নিমিত্ত লোকের গমনাগমন রহিত হইত।

অধুনা যে বাটীতে পুলিশ রহিয়াছে ঐ বাটীতে বণিক রাজ জন্ পামার সাহেব বাস করিতেন। ইঁহার পিতা হেষ্টিংশ সাহেবের সেক্রেটারী ছিলেন। জন্ পামার সাহেব অতিশয় দানশীল ও উদার স্বভাব হওয়ায় তাঁহার “বণিকরাজ” উপাধি বিখ্যাত হয়৷ ইনি ১৮৩৬ অব্দে লোকান্তরিত হন। ইহার অনুগ্রহেই শ্রীরামপুর নিবাসী রঘুগোস্বামী ধনবান হইয়া উঠেন। পামার সাহেবের বাটীর অন্য পার্শ্বেই পূর্ব্বে কলিকাতার কারাগার ছিল। ইং ১৮০০ অব্দে ব্রজমোহন দত্ত নামক এক ব্যক্তি একটা ওয়াচ ঘটিকা অপহরণ অপরাধে ফাঁসীদণ্ড প্রাপ্ত হয়।

ধৰ্ম্মতলার পূর্ব নাম এভেন্যু অর্থাৎ বারাসৎ, কারণ তাহার উভয় পার্শ্বে বৃক্ষ শ্রেণী ছিল। ধৰ্ম্মতলা নাম হইবার কারণ এই যে হেষ্টিংশ সাহেবের জমাদার জাফের নামক এক মুসলমান, যেখানে এখন কুকের আড়গড়া রহিয়াছে সেখানে এক মসজিদ নির্মাণ করে। পরে সেই স্থানে বর্ষে বর্ষে কার্বালার সময় সহস্র সহস্র মুসলমান একত্র হইতে থাকিলে ধৰ্ম্মতলা নাম হয়। এই ধৰ্ম্মতলার উত্তর পার্শ্বে এক খাল ছিল তাহা চাঁদপাল ঘাটের নীচে গঙ্গার সহিত সংযুক্ত থাকাতে উত্তরকালে নগর পরিষ্কার-রক্ষণের বিশিষ্ট উপায় ছিল। কর্ণেল ফরস্সাহেব লেখেন যে ঐ খালের পরিসর বৃদ্ধি করিয়া দিলে তাহাতে স্বচ্ছন্দে বড় বড় মহাজনী নৌকা গমনাগমন করিতে পারিত। এই খাল থাকাতেই মধ্যে মধ্যে বাদামিয়া দিঘির ধস্ নামিয়া থাকে।

ইং ১৭৯৩ অব্দে পাদ্রী জন ঔরেন সাহেবের উদ্যোগে নেটিভ হাসপাতাল নামক এদেশীয় লোকের চিকিৎসালয় সংস্থাপিত হয়। ইহাতে দেশ বিদেশবাসী বহুলোক প্রচুর দান করেনা লর্ড কর্ণওয়ালিশ, চীৎপুরের নবাব ও ঠাকুর গোষ্ঠী বিশিষ্টরূপ অর্থানুকূল্য করিয়াছিলেন৷ পূর্ব্বে ইহা চীৎপুর রোডের ধারেই ছিল—তদনন্তর ইং ১৭৯৮ অব্দে কাৰ্য-নির্বাহকগণ ধৰ্ম্মতলায় ভূমি ক্রয় পূর্বক বর্তমান বাটী নির্মাণ করেন।

কলিকাতা নগরের শোভা প্রতিভার গর্বস্থল চৌরঙ্গী দর্শনে সদ্য আগত বিদেশীয় লোকেরা চমৎকৃত হন, কিন্তু একশত বৎসর পূর্বে এই চৌরঙ্গী ভয়ানক হিংস্র পশ্বাদির বসতিস্থলী ছিল। এইক্ষণে এই নগরে এক বর্ষিয়সী বিবি বর্তমানা আছেন যিনি চৌরঙ্গীতে দুইটিমাত্র বাটী দেখিয়াছিলেন। তাহার একখানি বাটীতে স্যর ইলাইজা ইম্পি সাহেব বাস করিতেন। ঐ বাটীতে এখন ক্যাথেলিক ধৰ্ম্মাবলম্বিনী কৌমার ব্রত ধারিণীগণ অবস্থান করিতেছেন। যে স্থানে ইহাদিগের ভজনালয় রহিয়াছে, ঐখানে পূর্ব্বে ঘোলতালাও নামে এক পুষ্করিণী ছিল। ইম্পি সাহেবের পার্ফ অর্থাৎ মৃগালয় মিডিলটন স্ট্রীট হইতে আরম্ভ হইয়া পার্ক স্ট্রীট পর্য্যন্ত বিস্তীর্ণ ও তন্মধ্যবর্তী পথের দুই পার্শ্বে বৃক্ষশ্রেণী সুশোভিত ছিল৷ সেকালে চৌরঙ্গীতে দস্যুভয় প্রযুক্ত ইম্পি সাহেবের বাটী সিপাহীর প্রহরায় থাকিত। চৌরঙ্গীর দ্বিতীয় বাটীতে এক্ষণে সেন্টপল্স নামক বিদ্যালয় সংস্থাপিত রহিয়াছে।

উড স্ট্রীট নামক বর্ম পার্শ্বে পূর্ব্বে যে বাটীতে চক্ষুর চিকিৎসালয় ছিল, ঐ বাটীতে কর্ণেল স্ট্রুয়ার্ট বাস করিতেন। ইঁহাকে সকলে "হিন্দু-ষ্টুয়ার্ট” কহিতেন, কারণ তিনি ভেদজ্ঞানী ছিলেন না। খৃষ্ট এবং কৃষ্ণকে সমতুল্য জ্ঞানে তিনি আরাধনা করিতেন।

হালসীর বাগানে উমাইচাঁদ নামক প্রসিদ্ধ ধনকুবের বাস করিতেন। অন্যূন ৪০ বৎসরাধিক এই ব্যক্তি কোম্পানীর সহিত বাণিজ্য করিয়া বিপুল বিভবের অধীশ্বর হইয়া ভূপালবৎ মহা আড়ম্বরে কালযাপন করিতেন। কলিকাতার প্রথম অবস্থায় তিনি তদ্রত্য অধিকাংশ বাটী ও ভূমির অধিকারী ছিলেন৷ ক্লাইভ সাহেব পলাশীর যুদ্ধে তাঁহাকে ত্রিশলক্ষ টাকা উৎকোচ প্রদানের অঙ্গীকার করিয়া পশ্চাৎ তাহাতে চাতুরী করায় উমাইচাঁদ ক্ষিপ্ত হইয়া প্রাণত্যাগ করেন।

বৈঠকখানা নাম হইবার তাৎপর্য্য এই যে মহারাট্টারা গঙ্গার পশ্চিম পারে মহা অত্যাচার করাতে পূর্বে পূর্বাঞ্চল হইয়া বাণিজ্য কাৰ্য চলিত সুতরাং বৈঠকখানাই উত্তর ও পশ্চিম দেশে যাইবার সিংহদ্বার স্বরূপ ছিল। ঐ স্থানে এক প্রকাণ্ড বৃক্ষতলে ব্যবসায়ীগণ সমবেত হইয়া যাত্রা করিতেন৷ তজ্জন্য বৈঠকখানা নাম হইয়াছে-ঐ বৃক্ষ এক্ষণে বর্তমান নাই। বৈঠকখানায় পূর্বে ৭০ পাদ উচ্চ এক রথ ছিল।

শিয়ালদহে পূর্বে ধান্য জন্মিত। একশত বৎসর হইল উক্ত অঞ্চলের বর্ম একটা জঙ্গল ছিল। এইখানে নবাবী সেনার সহিত ইংরাজদিগের ঘোরতর যুদ্ধ হয়। ইং ১৭৮১ অব্দে হেষ্টিংশ সাহেব মুসলমানদিগের বিদ্যাভ্যাস নিমিত্ত পুরাতন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন ১৮২৪ অব্দে সেখান হইতে কলিঙ্গাস্থ নূতন অট্টালিকাতে তাহা স্থাপিত হয়। কোন বিজ্ঞ লেখক কহেন, যদিও মুসলমান বিদ্যাশিক্ষার স্থান পরিবর্ত্তন হইয়া শোভনতম সৌধমধ্যে তাহা সংস্থাপিত হউক কিন্তু মুসলমানদিগের চরিত্র বিষয়ের কিছুমাত্র পরিবর্তন হয় নাই৷ শিয়ালদহ হইতে নূতন খাল আরম্ভ হয়। এই খালের ১৮২৪ অব্দে সূত্রপাত হইয়া ১৮৩৪ অব্দে তাহা সমাপ্ত হইয়াছে। ইহাতে যদিও ১,৪৪৩,৪৭০ টাকা ব্যয় হইয়াছিল কিন্তু শুল্ক যোগে তাহা পরিশোধ হইয়া এক্ষণে বিলক্ষণ লাভের কারণ হইয়াছে।

নগরের পূর্বধারে যে বাদা রহিয়াছে পূর্ব্বে তাহার গভীরতা ও পরিসর বাহুল্য রূপ ছিল। ১৭৪০ অব্দের বর্ষাকালে তাহা একাকার প্লাবিত হয়। পূর্ব্বে তাড়দহ ইহার তীরবর্তী ছিল কিন্তু এক্ষণে তাহা বাদা হইতে অনেক দূরে রহিয়াছে। এখন বাদার গভীরতা স্থানে স্থানে ২০০ পাদের অধিক নহে এবং বোধ হয় তাহা ক্রমশঃ ভরাট হইয়া আসিতেছে!

সদরদেওয়ানী আদালত গৃহের পূর্বদিকবর্তী জেনারেল হাসপাতাল নামক চিকিৎসালয় অতি পুরাতন অট্টালিকা। ইহা পূর্বে কোন সাহেবের উদ্যান বাটী ছিল৷ ইং ১৭৬৮ অব্দে গভর্ণমেন্ট তাঁহার নিকট ক্রয় করিয়া চিকিৎসালয় সংস্থাপন করেন।

বুড়িগঙ্গার পূর্ব নাম গোবিন্দপুরের খাল। কারণ ঐ খাল গোবিন্দপুরের দক্ষিণ সীমা ছিল। তৎপরে ইহা সার্মনের খাল নামে খ্যাত হয়৷ অনন্তর ১৭৭৫ অব্দে কর্ণেল টালী সাহেব স্বীয় ব্যয়ে ঐ খালের পঙ্কোদ্ধার ও স্থানে স্থানে পরিসর বৃদ্ধি করিয়া দেওয়ায় তাহার নাম টালীর নালা হইয়াছে। গভর্ণমেন্ট তাহাকে ১২ বৎসরের শুল্ক গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহাতে খাল প্রস্তুত হইবার পরেই মাসিক ৪৩০০ টাকা আয় হইয়াছিল। কর্ণেল টালী সাহেব খালের কার্য্য সমাপ্ত হইবার অব্যবহিত পরেই পরলোক গমন করেন। টালী সাহেবের অধীনে জগন্নাথ সরকার নামক একজন চণ্ডাল খান খনন কার্য্যে নিযুক্ত থাকিয়া লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন পূর্ব্বক খিদিরপুরে প্রকাণ্ড প্রাসাদ প্রস্তুত পূর্ব্বক মহা ধুমধামে কাল যাপন করিত। উক্ত চণ্ডাল দেওয়ান ঘোষালের জুতা ফিরাইয়া দিবার ভৃত্য ছিল। যাহা হউক কর্ণেল টালীর নামেই টালীগঞ্জ প্রসিদ্ধ হইয়াছে। প্রায় ৬৫ বৎসর গত হইল এই খালের ধারে বড়িষাবাসী সাবর্ণদিগের দ্বারা কালীঘাটের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে।

আলীপুরের দক্ষিণে বেলভিডিয়র নামক মনোহর অট্টালিকাতে এখন লেপ্টেনান্ট গভর্ণর সাহেবের আবাস হইলেও পূর্ব্বে ঐ বাটীই গভর্ণর জেনারেলদিগের আরাম গৃহ ছিল। ১৭৬৮ অব্দের অনেক পূর্ব্বে ঐ বাটী বর্তমান ছিল এমন অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। হেষ্টিংশ সাহেব এই প্রাসাদে অবস্থান করিতেন এবং মহা ঘটায় নিকটস্থ জঙ্গলাদি প্রবেশ করিয়া ব্যাঘ্র বরাহ প্রভৃতি বন্যজন্ত সংহার করিতেন। উক্ত পুলের উত্তরে ঘোড় দৌড়ের মাঠের মধ্যস্থলে হেষ্টিংশ সাহেব স্বীয় প্রতিযোগী ফ্রান্সিস সাহেবের সহিত পিস্তল যুদ্ধ করিয়াছিলেন। ঐ স্থানে দুটি বটবৃক্ষ ছিল, তন্মধ্যে একটি বৃক্ষের কিয়দংশ এখনও বর্তমান আছে৷ সাহেবেরা ঐ বৃক্ষদ্বয়কে "হত্যাবৃক্ষ” নামে অভিহিত করিতেন।

ইং ১৭৮৩ অব্দে মেজর কিল্ প্যাট্রিক হাবড়াতে মিলিটারি অরফ্যান্ স্কুল সংস্থাপন করেন। তারপর সেই স্কুল ১৭৯০ অব্দে খিদিরপুরে স্থানান্তরিত হইয়া বর্ত্তমান প্রকাণ্ড অট্টালিকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বে এই দেশের গ্রীষ্মের আতিশয্য ভয়ে বিলাত হইতে বিবি লোকেরা অতি অল্প আসিতেন-সুতরাং দয়িতাভিলাষ পূরণের নিমিত্ত উক্ত বিদ্যালয় বিলক্ষণ উপযোগী হইয়াছিল৷ কারণ সেখানকার বালিকাগণ সুশিক্ষিতা হইলে পর বরের অভাব থাকিত না। সাহেবরা দূর দূরান্তর হইতে আসিয়া খিদিরপুরের বিদূষীমণ্ডলী মধ্যে মনোমত সঙ্গিনী নির্ববাচন পূর্বক পাণিপীড়ন করিতেন৷ এজন্য তথায় মধ্যে মধ্যে রজনী যোগে নৃত্য ও ভোজনাদির মহতী সভা হইত।

ইং ১৮০৮ অব্দে কর্ণেল কীড সাহেবের এদেশীয় স্ত্রীজাত দুই পু...ও জর্জ টমাস সাহেব কর্তৃক খিদিরপুর ডক ইয়ার্ড স্থাপিত হয়৷ ঐ ভূমি তাঁহারা দেওয়ান গোকুল ঘোষালের পত্নী রাজেশ্বরী দেবীর কাছে পাট্টা করিয়া লন। কোন মহাশয় লিখিয়াছেন কর্ণেল কীড হইতে খিদিরপুর নাম হইয়াছে কিন্তু এ কথা অতি ভ্রমমূলক। কর্ণেল কীডের অনেক পূর্ব্বে খিদিরপুর নাম প্রচলিত ছিল তাহার বিস্তর প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে৷ মুসলমানেরা খেজর নামক পীর হইতে আজিও এই স্থানের নাম খেজরপুর কহিয়া থাকে। কর্ণেল কীডের পুত্রেরা অতি অল্পকাল ঐ স্থানে বাস করিয়াছিলেন।

এই ডক ইয়ার্ডের অব্যবহিত পরেই মুচিখোলা প্রবেশে যে উদ্যান বাটী আছে তাহাতে সার্মান সাহেব বাস করিতেন। ইনি দিল্লীশ্বরের নিকট হইতে কোম্পানীর কারণ শেষ ফাৰ্ম্মাণ আনিতে গিয়াছিলেন। খিদিরপুরের পুলের পূর্বনাম সার্মান সাহেবের নামে খ্যাত ছিল।

মুচিখোলার পরপরেই কোম্পানী বাগান-এই বাগানের আদি প্রতিষ্ঠাতা কর্ণেল কীড সাহেব। তাঁহার স্মরণার্থে উদ্যানের মধ্যস্থলে সূচারু সমাধি গৃহ আছে। উদ্যানের কিছু পূর্বদিকে বিশপস্ কলেজ নামক প্রসিদ্ধ বিদ্যালয়। এই কলেজের তুল্য বিদ্যাভাসের উপযুক্ত রম্যস্থান ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয় নাই। কোম্পানীর উদ্যানে অধ্যক্ষ সাহেবের বাটীর কিছু দক্ষিণে তানা নামক এক নবাবী দুর্গ ছিল৷ ইং ১৬৮৬ অব্দে সেই দুর্গের সৈন্যেরা ইংরাজদিগের ৬০ তোপ বাহিনী এক তরণী প্রবেশে প্রতিষেধ উপস্থিত করিয়াছিল৷ (Calcutta Review No. VIII-476-484 pp)

ইং ১৭০০ অব্দে হাবড়াতে আরমানীদিগের বহুসংখ্যক বাটী ও উদ্যান ছিল। বহুকাল অবধি শালিখা জনাকীর্ণ স্থান মধ্যে গণনীয় আছে। ঐ স্থানে কাশীর পথ সমাপ্ত হওয়ায় বহুলোকের সমাগম হয়। ইং ১৮৬৫ অব্দে শালিখায় অন্যূন ৭৩৪৪৩ জন লোকের বসতি ছিল।

॥সমাপ্ত॥